Home Bangla ছোট গল্প গুপ্তধন

গুপ্তধন

36
0
গুপ্তধন
গুপ্তধন

‘নিশ্চই নাতনির কাছে লুকিয়ে রেখেছে!ভালো করে সার্চ করলেই পাওয়া যাবে।”

তীব্র হুঙ্কার দিয়ে উঠল বাড়ির মেজোছেলে।

“ইয়ার্কি মারার আর জায়গা পায়নি।আমি নিইনি বাপ।হুঁ!ও না নিলে আর কে নেবে শুনি?বাকি সবাই তো ঘরের লোক!ওই পুঁটলি সমেত বের করে দেব!একবার জিনিসটা শুধু পাই।”

উৎসাহী সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ল বুড়ির নাতনির ওপর।দু’চারটে কিল চড়ও পড়ল।ছোটো বোউ আর এক কাঠি উপরে গিয়ে চুলের মুঠি ধরে ঝাঁকুনি দিতেই বেচারা বাচ্ছা মেয়েটি কঁকিয়ে উঠল।ছোট্ট একটা হাতব্যাগ সবসময় বাচ্ছাটার সাথে থাকত।ব্যাগটা হাতড়ে ফেলল সবাই।কিন্তু নাঃ!কিচ্ছু পাওয়া গেলনা।বুড়ির সম্বল পুঁটলি তো আগেই তোলপাড় করা হয়েছে।তবে গেল কোথায় নতুন বউ এর আঙটি!সবাই বসল আলোচনায়।

এই অবধি বলেই ঠাকুমা চুপ করে গেলেন হঠাৎ।অবাক হয়ে মুখ তুলে দেখলাম ঠাকুমার চোখ থেকে দু ফোঁটা জল তার গাল বেয়ে নামছে।সদাহাস্যময় ঠাকুমার চোখে জল দেখে বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল।ব্যাকুল হয়ে বললাম,”থাকনা ঠাম্মা।পরে কখনো শুনবো।”

ঠাকুমা ঘাড় নাড়লেন।”না রে।মানুষের জীবন বড় বিচিত্র।আজ না বললে হয়ত আর কখনোই বলা হবেনা।আর না বললে যে বড় অবিচার করা হবে।আমার বাপের বাড়ির রক্তের বলতে তো শেষ অবধি ওই মানুষটাই ছিল।শুধু আজ এতোদিন পরে আবার তার কথা।বড় দুঃক্ষু হচ্ছে রে!”

ঠাকুমা আবার বলতে শুরু করলেন আর আমি মনের খাতায় লিখে চললাম আমার মত করে।

বুড়ি তখন থরথর করে কাঁপছে।শেষ অঘ্রানের শীতে নয়।আরো বড় কামড় যে আপনজন দেয় তা বুড়ি ভালোমতো জানে।একমাত্র নতুন নাতবউ বাদে কেউ একবারও প্রতিবাদ করলনা!মৃত্যুর দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে এই অপমান অত্যাচার বুড়ির শরীরে সইবে কেমন করে।বাবা উচ্চ বংশ দেখেই বিয়ে দিয়েছিলেন।সম্পত্তিশালী পরিবার।বাড়ির বড় বউ হলেন তিনি।জমিজায়গা পুকুর সব ছিল।কিন্তু সুখের দিন বেশি টেকেনি।মেয়েটা হতেই স্বামী হঠাৎ সাপের কামড়ে মারা গেল।শ্বশুর শাশুড়ি মেয়ে হবার পরে চটেই ছিল।তার ওপর স্বামীহারা হতেই শুরু হল অপবাদের পালা।অপয়া বউকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে তবে শান্তি।বাপও তদ্দিনে সগগে গেছে।ভায়েদের সংসারে মুখ বুজে সব অপমান সয়ে মেয়ে নিয়ে বেঁচে থাকা।লোকের বাড়ি কাজ করে দুটো পেট চালানো।তারপর মেয়েটার বিয়েও দিলেন কোনোরকমে চেয়ে-চিন্তে।মেয়ের ঘরে ঠাঁই নিলেন।কিন্তু যে মেয়েকে এত কষ্ট করে মানুষ করলেন সেও তাকে আপদ মনে করল খুব শিগ্গির।একমাত্র মেয়ে আর জামাই তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিল।বড় অভাব নাকি তাদের সংসারে।কিন্তু অভাবটা যে কিসের বুড়ির বুঝতে দেরি হয়নি।

অবশেষে শেষ বয়েসের আশ্রয় ভেবে চলে এসেছিলেন সব ছেড়ে নিজের বোনপোদের কাছে।আঁকড়ে ধরেছিলেন তাদের।সম্পর্ক খড়কুটোই বই আর তো কিছু নয়!

ছোটো বোনপো বিশাল ইঞ্জিনিয়ার।ছোটো থেকে কোনোদিন ক্লাসে সেকেন্ড হয়নি। ভারতের নানা জায়গা ঘুরে আমেরিকাতেও কিছুদিন ছিল।বাড়ির কাছেই একটা ফাঁকা জমি কিনে বাড়ি করেছিল।প্রায় ছ’কাঠা জায়গার ওপর বাড়ি।চারদিকে বাগান।আর লাগোয়া একখানা মাটির বাড়ি যেটা জমির পূর্ববর্তী মালিক বানিয়েছিল।কিন্তু বিয়ের পর আচমকাই কোলকাতা থেকে বম্বে ট্রান্সফার হয়ে যাওয়ায় পড়ল মহা ফাঁপড়ে।বাড়ি আর বাগানের কি হবে।লোকে তো লুটে খাবে।ঠিক সেই সময় এসে হাজির হল মাসি।বহুদিন কোনো যোগাযোগ ছিলনা।ওই মাঝেমাঝে এসে দেখা করেই চলে যেত।কিন্তু এবার একেবারে পাকাপাকি এসেছে।মেয়ের ঘরও বুড়ির কপালে জোটেনি।প্রথমে খানিক বিরক্ত হলেও ব্রিলিয়ান্ট ছাত্র ছোটো বোনপো বুঝেছিল তার বাড়ি আর বাগান খানা লুটপাট হবার হাত থেকে বাঁচাতে গেলে এই বুড়িই সহায়।দুই দাদা যখন কি করা যায় মাসিকে নিয়ে এই চিন্তায় ব্যস্ত তখন তাদের থামিয়ে বলেছিল,”শোন্।মাসি বরং আমার বাড়ির লাগোয়া ওই মাটির বাড়িটায় থাকুক।বাগানের ফলমূল বেচে যা পাবে তা দিয়ে না হয় নিজের খরচটুকু চালিয়ে নেবে।তারপর আমি ফিরে এলে অন্য একটা ব্যবস্থা করা যাবে খন।”

সবাই হাঁপ ছেড়েছিল।আর বুড়ি মা বড় নিশ্চিন্ত হয়েছিল।হাজার হোক মায়ের পেটের বোন।বাকি দুই ছেলের অবস্থা তেমন নয় যে আশ্রিত কারো দায়িত্ব নেবে।ছোটো ছেলে তবু মুখ রেখেছে।বুড়ি মাসি তার পুঁটলি খানা নিয়ে গিয়ে উঠেছিল মাটির ঘরে।যদিও ছাদহীন মাথায় সেই টালির চাল দেওয়া ঘরখানা মনে হয়েছিল রাজপ্রাসাদ।মনে মনে অনেক আশির্বাদ করেছিল বোনপোদের।আর আড়ালে নিয়তি মুচকি হেসেছিল।

“তখনই বলেছিলুম এসব বিয়েবাড়িতে ওদের ডেকোনা।তখন তো শুনলে না আমার কথা।”

চেঁচিয়ে উঠল বাড়ির মেজোবউ।

“তাও আবার মেয়ের ঘর থেকে নাতনিটাকে জুটিয়ে আনল।তখনই জানতুম কিছু একটা প্ল্যান কষছে!”

ছোটো বউ বলল,”কত্ত ফল আমাদের বাগানে।আমরা তো খেতেই পেলুমনা।এই ক’মাসে বেচেবুচে কম টাকা পায়নি।তাও এত লোভ!জানিনে বাপু।এই বয়েসেও..”

বাড়ির ছেলেরা আলোচনা সেরে এসে ঘোষনা করল যে আংটি যখন পাওয়া যায়নি তখন বুড়িকে পুলিশে দিয়ে লাভ নেই।নাতনিটাকে পাঠিয়ে দেওয়া হোক বাড়িতে আর বুড়ি যা পারে করুক।তবে এ বাড়িতে তার আর ঠাঁই নেই।বুড়ি নিঃশব্দে চোখের জল ফেলল। পুঁটলিখানা তুলে নিয়ে নিজের ছোটোখাটো সব জিনিস গুছিয়ে নিল।একখানা পানের ডিবে,জর্দার কৌটো,দাঁড়া ভাঙা চিরুনি আর একটা সাদা থান কাপড়। একেবারে নতুন। বিয়েবাড়ির জন্য পাওনা হয়েছিল। ভালোবাসার উপহার ভেবে ওটা আগলে রেখেছিল বুড়ি।কতদিন কেউ কিছু ভালোবেসে হাতে তুলে দেয়নি।বড়বউ ওটা দিতে আনন্দে বুড়ির চোখে জল এসেছিল। ভেবেছিল বড় বোনপোর ছেলের বৌভাতের দিন পড়বে।ওইদিনই তো লোকজন বেশি আসবে।কিন্তু কাল বিয়ে মিটতেই আজ সক্কাল বেলা নতুন বউ এর আঙটিখানা চুরি হল।আর সব হিসেব উল্টে গেল।নিয়তির হিসেবই শেষ কথা।মানুষ সেখানে বড় অসহায়।সবকিছু বেঁধে নিয়ে আবার চোখের জল মুছে ভগবানকে বলল,”এদের মঙ্গল কোরো ঠাকুর!”

তিনদিন পার হয়ে যাওয়ার পর সবাই নিশ্চিন্ত হল যে বুড়ি আর আসবেনা।আপদ গেছে। নিশ্চয় পেটের মেয়ে ফেলতে না পেরে সঙ্গেই নিয়ে গেছে।চারদিনের মাথায় হঠাৎ মেজোছেলে বাড়িতে হুলস্থুল বাঁধাল।কী একটা কাজে কোলকাতা গিয়েছিল।ফিরে স্টেশনে নামতেই তাকে ঘিরে ধরে একদল পান্ডা।স্টেশনের এক প্রান্তে এক মরনাপন্ন বুড়ি পড়ে আছে।ক’দিনই ভিক্ষা করছিল।বহুবার জানতে চাওয়ায় সে নাকি তার নামই নিয়েছে।

“এবার সামলাও।প্রেস্টিজ গেল।ছোটোভাই তো নিশ্চিন্তে বম্বে চলে গেল।আমাকে তো বাইরে বেরতে হয় নাকি।”বড়দাকে বলল।

“দেখ।এখন দুটো উপায়।হয় মাসিকে বাড়ি নিয়ে আসা আর নইলে ওখানেই কিছু একটা ব্যবস্থা করা।”বড়দা বলল।

“কিন্তু পেটের মেয়ে এভাবে দায় ঝেরে ফেলল।আর আমরা কেন..ওহ!কী মেয়ে বাপু।নিজের মা’কে স্টেশনে ফেলেই চলে গেল!”

অনেক আলোচনার পর বাড়ির বোউদের পরামর্শ ক্রমে,মায়ের চোখের জল দেখে সিদ্ধান্ত হল বুড়িকে বাড়িই নিয়ে আসতে হবে।

পরের দিন কনকনে ঠান্ডা।আর তেমন কুয়াশা।বছরের সেরা।দুহাত দূরেও কিছু দেখা যাচ্ছেনা।মেজোছেলে গেল বুড়িকে আনতে।স্টেশনের শেষ প্রান্তে ডাস্টবিনের পাশে বুড়ি আছে সেটা আগেই জেনেছিল।গিয়ে দেখল অনেক মানুষের ভীড়।তাদের জটলায় বোঝা গেল বুড়ি ভবসাগর পাড়ি দিয়েছে রাতেই।পৌষের ঠান্ডা তার প্রানপাখিকে খাঁচাছাড়া করেছে।এদ্দিনে নিয়তি তার কৃপাদৃষ্টি রেখেছে।তাকে তার সঠিক ঠিকানায় পৌঁছে দিয়েছে।

একপাশে পুঁটলি খানা খোলা পড়ে।পানের ডিবে জর্দার কৌটো চিরুনি এদিক ওদিক ছড়িয়ে।কেউ নিশ্চয় হাতড়েছে কিছু পাবার আশায়।হলই বা ভিখারী।যদি কিছু মেলে।ঠিক যেমন বুড়ি তার গোটা জীবন শুধুই হাতড়ে বেরিয়েছে একটুখানি ভালোবাসা।কিন্তু পড়ে রয়েছে তার অগোছালো শতছিন্ন জীবনের ভগ্নস্তূপ!নিয়তি যে তার প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা বুড়ির জীবন খুঁড়েই চালিয়েছে!

পুঁটলিতে নোংরা কাপড় আর হাবিজাবি জিনিসের মাঝে বড় বেমানান হয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে সাদা নরুনপেড়ে নতুন থান শাড়িটা।বুড়ি যেটা আগলে রেখেছিল গুপ্তধনের মত।ভালোবাসার একমাত্র নিদর্শন যে ওটুকুই ছিল তার।

ঠাকুমা আবার থামলেন।বুঝলাম ঠাকুমার গলা বুজে এসেছে।ছেলেমেয়ে বউমা নাতি নাতনি ভরা সংসারে তার দুটো চোখ আজও

সেই ছোট্ট বোনটাকে খোঁজে।ঠিক গুপ্তধনের মত যাকে আগলে রেখেছেন নিজের মনের মনিকোঠায়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here