Home Bangla অন্য স্বাদের গল্প

অন্য স্বাদের গল্প

86
0

একটা জিনিস খেয়াল করছিস??

ছেলেটা আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে তাইতো??

তুই কি করে বুঝলি??

তোমার চোখে আমি বিশ্বচরাচর দেখতে পাই …আর কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে যে ছেলেটা তোমার দিকে লোভাতুর দৃষ্টি দিচ্ছে আমি তাকে দেখতে পাবো না !? অহনা গাল টিপে দিলো অভিরূপের | “যাই বল, ছেলেটাকে কিন্তু মারকাটারি দেখতে.. মুখ দেখে মন পড়ে ফেলা যায় একদম | অভিরূপ ব্যঙ্গ করলো ” তাই?? ঠিক আছে | তুই মনলিপি উদ্ধার কর | আমি চলি”| অভিরূপ ফলস পদচালনা করতে উদ্যত হলো | অহনা জড়িয়ে ধরলো “রাগ করে না বাবু.. প্লিজ প্লিজ” বলেই খিল খিল করে হেসে উঠলো | অভিরূপ এবার আড়চোখে চাইলো ছেলেটার দিকে | হাইটে অভিরূপের মতোই.. পুরুষের ক্ষেত্রে যা বিলো এভারেজ | তবে তাক- লাগানো চেহারা স্বীকার করতে হবে | উর্বর চামড়া.. তাতে দাড়ির ফলন ভালো হয়েছে এব্যাপারে সন্দেহ নেই | দাড়ির গুচ্ছ জায়গায় জায়গায় সমানভাবে বন্টিত | টার্মিনাল দুটো ঝুলপির সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে | গোঁফের শাখাদুটো বক্রাকারে এসে মিশেছে দাড়ির সমুদ্রে | বদ্বীপের মাঝখানে একচিলতে ঠোঁট | তার বেশিটাই গোঁফের আড়ালে চলে গেছে | ” এ একেবারে মডার্ন কার্তিক ! রূপ যেন উথলে পড়ছে ! যাই আমি খানিকটা সংগ্রহ করে আসি |” অহনা চিমটি কাটলো কুটুস করে ” ফিলিং জেলাস??” অভিরূপ মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকালো | অহনা অভিরূপের নাকে নাক ঘষে দিলো |” পরস্পর পুনরায় বাহুবন্ধনে আবদ্ধ হলো | দুজনেরই খেয়াল হলো ছেলেটা ঘরে ঢুকে গেছে | কিন্তু এই নিয়ে কেউ আর কোনো মন্তব্য করলো না |

রাতে বিছানায় শুয়ে অহনা বললো ” ছেলেটা গায়ে কতকিছু চাপিয়েছিলো খেয়াল করেছিস?? অতটাও ঠান্ডা নেই বল !” অভিরূপ হাসলো আলতো করে “কাঠমান্ডুতে এখন যথেষ্ট ঠান্ডা মাই ডিয়ার | আমরা টের পাচ্ছিনা কারণ আমরা হানিমুন করতে এসেছি .. এখন আমাদের রক্ত গরম , শ্বাস-প্রশ্বাস গরম .. হানিমুন ইটসেলফ একটা গরম গরম হট হট ব্যাপার !!” অভিরূপ দুষ্টু হাসি দিলো | অহনা খুনসুটি করলো ” জানি তো ! তুমি তো আমার হিটার সোনা !” অহনা এবার বড় করে একটা হাই তুললো “আজকে আর পারছিনা রে বাবু, ঘুমিয়ে পড়ি.. .. অনেক হৈ হুল্লোড় করেছি আজকে |” “আচ্ছা শুয়ে পড় সোনা.. আজকে অনেক নাচানাচি করেছিস.. গুড নাইট|” অভিরূপ আলো নিভিয়ে দিয়ে শুয়ে পড়ল |

পাঁচমিনিট হয়ে গেলো অভিরূপের এখনো ঘুম আসছে না | অহনা নাসিকানিনাদ করছে | অন্যদিন ঘুমপাড়ানি লাউড মিউজিক মনে করে ঘুমিয়ে পড়ে | আজ জিছুতেই চোখের পাতা এক করতে পারছে না | অভিরূপ উঠে গিয়ে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ালো | বাইরে এখন হাড়কাঁপানো ঠান্ডা | অভিরূপ ভাইব্রেট করে চলেছে | এমন সময় চোখ গেলো পাশের পাশের ঘরে | আলো জ্বলছে | ছেলেটা তাহলে ঘুমায়নি এখনো | করছেটা কি?? নামতা মুখস্ত করছে নাকি ?? অভিরূপ দেখলো বেশি মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই | যদি ওর ঘরে ঢুকে গলা টিপে দিয়ে আসতে পারত তাহলেও একটা ব্যাপার ছিল | বরঞ্চ স্মৃতিচারণা করি | কাজে দেবে | কিন্তু তাতেও ব্যাঘাত | ওর যাবতীয় স্মৃতি চার বছর আগের সেই দিনটাতে এসে হল্ট করে যায় | তিতাস | অভিরূপের প্রথম গার্লফ্রেন্ড | দীর্ঘ পাঁচ বছরের সম্পর্ক ভেঙে গুড়িয়ে, একেবারে মাড়িয়ে দিয়ে পালিয়ে গেছিলো | একটা চিঠি টেবিলের উপর বাটি চাপা দিয়ে রেখে গিয়েছিলো যাতে লেখা ছিল “আমি পালিয়ে যাচ্ছি| চিন্তা নেই.. কারোর সঙ্গে নয়, একা যাচ্ছি | অনেক দূরে | তোমরা আমার খোঁজ কোরোনা | উদ্দেশ্যহীন হয়ে যাচ্ছি না তবে উদ্দেশ্য কতটা সফল হবে তাও জানিনা | অভিরূপকে বলে দিয়ো আমাকে ভুলে যেতে | আমি ওর অযোগ্য | যেখানেই থাকি জেনে রেখো ভালো থাকবো না | আমার লড়াই আমার নিজের সাথে | তোমরা কেউ আমার শত্রু নও |” খোঁজাখুঁজি যে হয়নি তা নয় তবে ব্যাপারটা যেহেতু কিডন্যাপিং কেস নয় তাই চাপা পড়ে গিয়েছিল | তিতাসের মা পার্মানেন্ট শয্যাশায়ী হয়ে পড়েছিলেন | অভিরূপ একেবারে মেরুদন্ডহীন হয়ে গিয়েছিলো | খেতে পারতো না, ঘুমাতে পারতো না.. পড়াশোনা তলানিতে নেমে গিয়েছিলো | সেই অসময়ে ওর পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল অহনা | আজ অভিরূপ যেটুকু ভালো আছে তার সম্পূর্ণ কৃতিত্ব অহনার একার | ওদের তিন বছরের সম্পর্ক শেষে পরিণতি পেলো গত সপ্তাহে | অভিরূপ ভিতরে ভিতরে নিজেকে আজও অপরাধী বলে মনে করে | অহনার প্রতি ওর ভালোবাসায় কোথায় যেন একটা খামতি থেকেই গেছে | তিতাস কে যেভাবে উজাড় করে দিয়েছিলো অহনাকে কেন দিতে পারেনা? রোজ না হলেও মাঝেমধ্যেই তিতাসের কথা মনে পড়ে যায় | সেই পাগল তিতাস | সেই সবার থেকে আলাদা তিতাস | এই খুব ভালো থাকে তো পরমুহূর্তে খারাপ | ভিনগ্রহের প্রাণী বললেও চলে | অভিরূপ পাগলের মত ভালোবাসতো তিতাস কে | তিতাস ও ভালোবাসতো অভিরূপকে | তাহলে হঠাৎ পালিয়ে গেলো কেন তিতাস? অভিরূপ তিতাস কে দোষারোপ করে স্বস্তি পায় | তা ছাড়া তিতাস যা করেছে সেটা ক্ষমার অযোগ্য | আর ভাবতে চাইলো না অভিরূপ | ঘুম পেয়েছে | ঘরে এসে শুয়ে পড়লো | পাশের পাশের ঘরের লাইট টাও টুক করে নিভে গেলো ! <

ব্রেকফাস্ট টেবিলে একা বসে আছে ছেলেটা | অহনা একটা ফাঁকা টেবিল খুঁজে বেড়াচ্ছে | অভিরূপ ফুট কাটলো "এই যে ম্যাডাম, রূপবান একা বসে বসে রুটি চিবোচ্ছে | যান গিয়ে একটু কোম্পানি দিয়ে আসুন !"অভিরূপের কথা শুনে অহনা পিছন ফিরলো | এইবার ছেলেটাকে দেখতে পেয়েছে | "আহা রে ! একা বসে আছে ছেলেটা | দেখে বড় মায়া হচ্ছে | চল কোম্পানি দিয়ে আসি |" বলে অভিরূপকে টানতে টানতে নিয়ে গেলো | ছেলেটি কিছু বুঝেই উঠতে পারলো না তার আগে চেয়ার টেনে বসে পড়ল অহনা | অভিরূপকেও ইশারা করলো | অসম্ভব মিশতে পারে মেয়েটা | অহনা অভয় দিলো "ডোন্ট ওয়ারি , টেল মি ওয়ান থিং… আর ইউ ইন্ডিয়ান?" ছেলেটা উত্তর দিলো "আমি বাঙালি |" অহনা চিৎকার করে উঠলো "বাহ্! এটাই তো চাই! বিদেশ বিভূঁইয়ে এসে একজন বাঙালি খুঁজে বের করা যে কতটা আনন্দের সে আপনি বুঝবেন না মশাই!" ছেলেটার উত্তরে অভিরূপ গর্বিত বোধ করলো | সাচ্চা বাঙালির বাচ্চা বলে কথা ! সারা দুনিয়ার মানুষের ভিড়েও বাঙালির টিকিটি ধরে ঠিক তুলে নেবে ! অহনা বকবক করেই চলেছে | ছেলেটাকে প্রশ্নেবানে ক্ষতবিক্ষত করে ফেলছে | ছেলেটা টু দি পয়েন্ট এনসার দিয়ে যাচ্ছে পাছে উত্তরগুলো আবার নতুন করে প্রশ্ন না জাগায় ! ছেলেটার নাম সংকেত | আদি নিবাস কলিকাতা, মানিকতলায় বাড়ি, কর্মসূত্রে লন্ডনে থাকে, সেখানে একটা এড এজেন্সি তে চাকরি করে , মাইনেপত্র খারাপ পায় না , এখানে নিছক বেড়াতে আসা, বিয়ে থা করেনি ইত্যাদি আরো অনেক কিছু !! অভিরূপ খেয়াল করলো ছেলেটা কথাবার্তা চলাকালীন আই কন্ট্যাক্ট এভোয়েড করছে | অহনার সাথে আই কন্ট্যাক্ট করতে না পারা টা স্বাভাবিক | ওর চোখে শাটার পড়েনা… একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে | কিন্তু আমার সাথে করতে কি অসুবিধা? তা ছাড়া আমিও তো পুরুষ মানুষ | নির্ঘাত কোনো বদ মতলব আছে | তাই অপরাধবোধ কাজ করছে | চোখে চোখ রাখতে পারছেনা | অহনা দুম করে একটা অফার করে বসলো "আজ আমরা দুজন রাজবাড়ি দেখতে যাচ্ছি | আপনিও চলুন |" সংকেত একশোবার না না করলো কিন্তু অহনার জোরাজুরিতে শেষমেশ যেতে রাজি হল |

অহনা আগে আগে হাঁটছে, তার পিছনে অভিরূপ, অভিরূপের পিছনে সংকেত | অহনা দৌড়ে দৌড়ে হাঁটছে বলা চলে… ওকে সিংহাসন দেখতে হবে ! অহনা অনেকটা এগিয়ে গেছে | পাছে ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে যায় তাই অভিরূপ ভাবলো সংকেত কে ডাকি | কিন্তু পিছন ফিরে দেখলো সংকেত নেই | কোথায় গেলো ছেলেটা?? এই তো ছিল! অভিরূপ জনস্রোতের প্রতিকূলে হাটতে শুরু করলো | যতটা এগোয় তার একটু বেশি করে পিছিয়ে যায় | শেষ অবধি এগোলো কি পিছোলো কে জানে দাঁড়িয়ে পড়ল এক জায়গায় | ডানদিকে মুখ ফেরাতে দেখলো এক অদ্ভুত দৃশ্য | দেওয়ালে টাঙানো ফ্রেমবন্দি একটা ছবি…কোনো পর্বতশৃঙ্গের.. সম্ভবত জলরঙে আঁকা | সংকেত ছবিটার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে | অভিরূপ পাহাড় খুব ভালোবাসে | তিতাসও ভালোবাসত | পাহাড়ের নামে জিভে জল এসে যেত তিতাসের ! কোনো পর্বতশৃঙ্গের ছবি দেখলে এইরকম লোলুপ দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকতো | ভবতো কবে যাবে | অহনার আবার সমুদ্র বেশি পছন্দের | অভিরূপ পাশে এসে দাঁড়ালো "আপনি পাহাড় খুব ভালোবাসেন, না??"আচমকা প্রশ্ন হওয়াতে সংকেত চমকে উঠেছিল | নিজেকে সামলে নিয়ে বললো "আমি আঁকা টা দেখছিলাম | খুব ভালো এঁকেছে তাই না??" বলে কোনো উত্তরের অপেক্ষা না করেই চোখ নামিয়ে চলে গেলো | অভিরূপ দীর্ঘনিশ্বাস ফেললো | তার পর্বতপ্রেম ভাগ করে নেওয়ার কেউ নেই | পাহাড় সম্পর্কে দুটো কথা শেয়ার করবার কেউ নেই | খেয়াল হলো অনেকটা পিছিয়ে গেছে | এবার দৌড় লাগালো |

রাজবাড়ী থেকে বেরিয়ে ওরা ঢুকলো ক্যাসিনো তে | শয়ে শয়ে লোক জুয়াখেলায় মজেছে | ধনদৌলত গাড়ি বাড়ি যা আছে সব বাজি রেখে দিচ্ছে | অভিরূপ আর সংকেত ও বসলো দুটো মেশিন এর সামনে | ১০০ টাকার বেট লাগালো | কিন্তু কপালে যা থাকে ! সংকেত নিজের মূলধন সাতগুণ করে ফেললো | ওদিকে অভিরূপ তার সবেধন ১০০ টা টাকাও রক্ষা করতে পারলো না |

অহনা বায়না ধরেছে আইসক্রিম খাবে | অভিরূপের মুখ দেখে মনে হচ্ছে জুয়া খেলে সর্বস্বান্ত হয়েছে, পথে বসতে চলেছে | সংকেত হঠাৎ করে বলে উঠলো "চলুন আমি আপনাদের খাওয়াচ্ছি" | কথাটা শুনে অভিরূপের মাথা আগুন গরম হয়ে গেলো | মনে মনে বললো " তা তো বলবেই বাছাধন | তোমার হাতে এখন টাটকা টাটকা ব্ল্যাকমানি ! তুমি না খাওয়ালে কে খাওয়াবে!!" অহনা ফলস বাধা দিলো "না না, আপনি আমাদের গেস্ট মশাই! অতিথির টাকায় খেলে ভদ্রসমাজ কি বলবে!" ছেলেটা লজ্জা পেলো "না, আমিই খাওয়াচ্ছি | প্লিজ বারণ করবেন না |"

আইসক্রিমপর্ব চুকিয়ে দিয়ে সকলে মার্কেটপ্লেসে এলো | অহনা নিজের ক্যামেরাটা বাড়িয়ে দিলো সংকেতের দিকে "কয়েকটা ছবি তুলে দেবেন আমাদের?" সংকেত ক্যামেরাটা নিলো, কয়েক পা পিছিয়ে গেলো , টপাটপ কয়েকটা ছবি তুলে দিয়ে ক্যামেরাটা হ্যান্ডওভার করে দিলো |" দুজনেই হতবাক হয়ে গেলো ! ডানে বাঁয়ে মাথা নাড়াতে বললো না, ঘাড় বেঁকাতে বললো না, একফালি দাঁত দেখাতেও বললো না… হয়ে গেলো ছবি তোলা !? তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো ছেলেটা সবকটা ছবিই অসাধারণ তুলেছে… হাত আছে বলতে হবে |

"আঁক" করে উঠল সংকেত | ইঞ্জেকশনের সিরিঞ্জ টা একটু বেশিই জোরে ঢুকিয়ে দিয়েছে | আরো একটা বছর… বেশিও লাগতে পারে | এই অসহ্য যন্ত্রনা আর কতদিন? আজকে আর ডিনার খেতে নিচে যাবেনা | ঘরে আনিয়ে নেবে |

ডিনার টেবিলে বসে গালে হাত দিয়ে ভাবছিলো অহনা… সংকেত কেন খেতে এলোনা? অভিরূপ বললো "কি ভাবছিস আজকের রাত টা উপোস করবি??" অহনা গাল থেকে হাত নামালো | বেশ চিন্তিত দেখাচ্ছিল | বললো "ছেলেটা এলো না কেন বলতো? শরীর খারাপ নয় তো ? তুই গিয়ে মেরে দিয়ে আসিসনি তো??" অভিরূপ রাগ করলো এবার "না তবে এখন গিয়ে মেরে দিয়ে আসছি |" মনে মনে বললো " সংকেত বাবাজি… ভালোই বশীকরণ করেছো ! আমার বৌ এখন তোমার চিন্তায় বিভোর | তুমি না হয় আমার থেকে ভালো দেখতে, ছবিটবি তুলতে পারো.. অস্বীকার করছি না |তোমার কাছে আমার একটাই নিবেদন.. পরস্ত্রীহরণ কোরোনা…একটাই বৌ আমার.. নিঃস্ব করে দিয়োনা আমায়…|"

বিছানায় বসে ল্যাপটপে মেল্ চেক করছে অহনা | প্রতিদিন নিয়মমাফিক শোবার আগে মেল্ চেক করে নেয় | একরাশ অভিমান নিয়ে তাকিয়ে আছে অভিরূপ | অহনা ঝড়ের গতিতে টাইপ করে যাচ্ছে | অভিরূপের মনে পড়ে গেলো তিতাসের কথা | কচ্ছপের মতো টাইপ করতো | তিতাস ওকে "ভীরু" বলে ডাকতো | অভিরূপ একদিন বলেছিলো "তুই তোর ল্যাপটপের পাসওয়ার্ড ভীরু রেখেছিস না??" তিতাস অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল "তুই কিকরে জানলি??" অভিরূপ বলেছিলো "তোর পিছনে দাঁড়িয়েছিলাম.. তুই যেরকম কচ্ছপের মত টাইপ করিস তাতে সব বোঝা যায় |" ….. অভিরূপ ফিক করে হেসে ফেললো | অহনা ল্যাপটপ থেকে মুখ না তুলেই বললো "কি হয়েছে , হাসছিস কেন??" অভিরূপ বানিয়ে বললো "ওই কিছুনা একটা জোক মনে পড়ে গেলো |" অহনা বললো "কি জোক? আমাকেও বল |" অভিরূপ বললো "ওই তো… বিয়ে না করার ডিসএডভান্টেজ.. খাটের দুদিক দিয়েই পড়ে যাবার সম্ভাবনা থাকে |" অহনা খেপে গেলো "ধুর!! যত্তসব!!"

লবি তে বসে আছে সংকেত | সামনে ল্যাপটপ খোলা | অভিরূপ সংকেতের পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে এমন সময় জোর ধাক্কা খেলো | হোটেলের এক ছোকরা কর্মচারী হন্তদন্ত হয়ে কোথাও একটা যাচ্ছিলো | অভিরূপকে দেখতে পায়নি … ধাক্কা মেরে দিয়েছে | "অরে ভাই দেখে চলবে তো ! অভিরূপ চেঁচালো | ছেলেটা বাংলা বুঝলো না "মাফ ক্যারিয়েগা বাবু, থোড়ি জলদি মে হুঁ " বলে বেরিয়ে গেলো | সংকেত ততক্ষনে ল্যাপটপ বন্ধ করে উঠে দাঁড়িয়েছে | অভিরূপকে জিজ্ঞাসা করলো "আপনি ঠিক আছেন তো?" অভিরূপ বললো "আমার আর কি হবে | আপনি খেতে চলুন | অহনা ডাকছে |"

ব্রেকফাস্ট খেতে বসে খুব মর্মভেদী একটা খবর দিলো সংকেত "আমি আজকে চলে যাচ্ছি | দুপুরে ফ্লাইট |" অহনা আকাশ থেকে পড়লো "চলে যাচ্ছেন মানে? নেপাল তো কিছুই দেখলেন না | এভারেস্টও দেখলেন না | পোখরা যাবেন না??" সংকেত বললো " আসলে এবার সময় নিয়ে আসিনি | পরে হয়তো কখনো…" অহনা বললো "কি আর বলবো বলুন | নেপালে এলেন, শুধু রাজবাড়ী ঘুরে চলে গেলেন , যে শুনবে তারই খুব কষ্ট হবে |"

গাড়ি এসে গেছে | সংকেত উঠে পড়লো | লাগেজ বলতে শুধু একটা রুকস্যাক | অভিরূপ আর অহনা ওকে এগিয়ে দিতে এসেছিলো হোটেলের গেট পর্যন্ত | গাড়ি ছেড়ে দিলো | অহনা হাত নাড়লো | সংকেত একবার হালকা করে হাত দেখালো | অভিরূপ জড়িয়ে ধরলো অহনাকে "বেঁচে গেলাম !!" অহনা আল্হাদি সুরে বললো "আজকে তোকে খুব আদর করে দেবো |" অভিরূপ নাকে নাক ঘষে দিলো | দুজনে ঘরের দিকে পা বাড়ালো |

গাড়িতে বসে ল্যাপটপ অন করলো সংকেত | মন্থরগতিতে পাসওয়ার্ড টাইপ করলো "ভীরু" | হোমস্ক্রিনে ভেসে উঠলো অভিরূপের ছবি… ছ বছর আগেকার | ডক্টর স্যামুয়েলের এপয়েন্টমেন্ট নিতে হবে | সংকেত, ওরফে তিতাসের sex reassignment therapy চলছে গত তিন বছর ধরে | এখনও কমসে কম আরো এক বছর চলবে | এপয়েন্টমেন্ট করে নিয়ে ল্যাপটপ বন্ধ করলো সংকেত |

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here