Home Bangla একটি গোলাপের জন্য

একটি গোলাপের জন্য

85
0

ঘোষ বাবু বিকেলে বাগানে জল দিতে গিয়ে খুশী হয়ে উঠলেন । লাল গোলাপের কুঁড়িটা এবার ঝরে পড়ে যায় নি । আধফোটা হয়ে গাছ আলো করে রয়েছে। এই প্রথম বার এই গাছে কোনো ফুল ফুটবে শেষ পর্যন্ত । এতদিন অনেক যত্নের পরেও কেন জানি কুঁড়ি এলেও অকালেই ঝরে পড়ে যাচ্ছিলো । একটাও ফুল ফোটে নি সারা শীত কাল। এবারে এই কুঁড়িটা দেখে মনে হচ্ছে কাল সকালেই পাপড়ি মেলবে লাল গোলাপ , ফুলেদের রাণী । কাল আবার রোজ ডে । ভালোবাসার মানুষকে একটা গোলাপ উপহার দেবার জন্য কাল ফুলের দোকানে ভিড় উপচে পড়বে । ফুলওয়ালারাও সুযোগ বুঝে দাঁও মারবে , এক একটা গোলাপের স্টিক চড়া দামে বিকোবে কাল।

তিনিই বা কম যাবেন কেন ? নাহয় একটু বয়স বেড়েই গেছে , চুলে অল্প পাক ধরেছে , কিন্তু মনটা তো বুড়িয়ে যায় নি! সকালেই ফুলটা তুলে গিন্নির হাতে দিয়ে একেবারে চমকে দেবেন তিনি। অবশ্য পয়সা দিয়ে ফুল কিনতে হলে অন্য কথা ছিল। একেবারে হাতের কাছে বিনি পয়সায় এমন তাজা গোলাপ পেয়েও গিন্নির কাছে নিজেকে আধুনিক প্রমাণ করার এই সুযোগ কাজে না লাগানোর মত বোকা তিনি অন্তত নন।

ঘোষ বাবুর বড় ছেলে রতন টিউশন শেষে বাড়ি ঢুকেই থমকে গেল। বাগান আলো করে রয়েছে একটা আধফোটা লাল গোলাপ । কি সুন্দর ! ফুলটা দেখেই রতনের মনে একটা মিষ্টি মুখ ভেসে উঠলো । কতদিন ধরে এই মেয়েটিকেই স্বপ্নে দেখে আসছে রতন । সে অবশ্য কিছুই জানে না। মায়াকাড়া চেহারার এই মেয়েটির নাম টুম্পা । সেই ক্লাস নাইন থেকে টুম্পার জন্য পাগল রতন। কলেজে সেকেন্ড ইয়ারে পৌঁছে গিয়েও এখনও পর্যন্ত নিজের মনের কথা টুম্পাকে খুলে বলার সাহস পায় নি রতন।

আজ এই গোলাপটা দেখেই রতনের মনে জেগে উঠলো অদম্য সাহস। কাল রোজ ডে না ! কাল সকালেই বিনয় স্যারের টিউশনে টুম্পার হাতে এই লাল গোলাপটা তুলে দিয়ে ওকে নিজের মনের কথা খুলে বলেই ফেলবে রতন। অনেক হয়েছে , আর ভয় পেয়ে পিছু হটবে না সে।

কাল টুম্পাকে গোলাপটা দিয়েই ও বলবে ,

” নিজেকে সেরা রূপসী মনে করে এই গোলাপটার খুব অহঙ্কার হয়েছিল । তাই আমি ওকে এমন একজনের হাতে তুলে দিলাম , যে আমার চোখে পৃথিবীর সেরা সুন্দরী ।

“টুম্পা অবাক হয়ে তাকাবে , তখনই রতন আসল কথাটা বলে ফেলবে , আমি তোকে ভালোবাসি টুম্পা ! তাই আমার চোখে তোর চেয়ে সুন্দর আর কেউ নয় !

“প্রপোজ করার কি দারুণ আইডিয়া এসেছে মাথায় ! নিজের আইডিয়াতে নিজেই মোহিত হয়ে একটা গান গুণগুণ করতে করতে নিজের ঘরে গিয়ে ঢুকল রতন ।

” তুমি যদি আমাকে সত্যিই ভালোবাসো , তাহলে কাল ওই গোলাপটা আমাকে এনে দেবে । ”

ঘোষ বাবুদের পাশের বাড়ির ছাদে ঘন হয়ে দাঁড়ানো এক যুগল ফিসফিস করে নিজেদের মধ্যে প্রেমালাপে মত্ত। এর মধ্যেই মেয়েটির নজর পড়ে গেছে অপরূপা গোলাপের কুঁড়িটির দিকে। তখনই ওর মনে জেগে উঠেছে ছেলেটার ভালোবাসার পরীক্ষা করার ইচ্ছে। ছেলেটাও হার মানবার পাত্র নয় , সে বুক ফুলিয়ে বলল ,

” এই গোলাপটা আর এমন কি ! আমি কাল তোমার জন্য বাজারের সেরা গোলাপটা কিনে নিয়ে আসব ।

না , আমার ওইটাই চাই !

“ছেলেটা মনে মনে ভাবল , মহা মুশকিল তো ! অন্যের বাগানে ঢুকে ফুল চুরি করার বিন্দু মাত্র ইচ্ছে নেই ওর । কিন্তু তাতে তো ও হেরে যাবে ! নাহ , যে করেই হোক ওই ফুলটা চুরি করতেই হবে ওকে ! ভালোবাসার পরীক্ষায় কিছুতেই হেরে যেতে চায় না ও পরদিন সকালে ঘোষ বাবু জলদি জলদি বাগানে গেলেন ফুলটা ছিঁড়ে আনতে। কিন্তু ফুলটা কই ! গাছ তো খালি ! কে নিল এই ফুলটা ! কার এত বড় সাহস! ঘোষ বাবু বাগানে দাপাদাপি করতে লাগলেন ,

কোন চোর আমার বাগানের গোলাপ ফুল চুরি করেছে ! কার এত সাহস! ”

বাবার চিৎকারে রতন দৌড়ে এলো , বাড়ির সবাই দৌড়ে এলো ! পাশের বাড়ির ছেলেটাও । কে নিল এই গোলাপ ! ওরা কেউ তো নেয় নি ! মানে নেয়ার সুযোগই তো পায় নি । এর আগেই তো ফুল গাছ থেকে হাওয়া ! ভারি রহস্যময় ব্যাপার তো ! এই ফুল চুরির রহস্য কি করে উদ্ধার করা যায় , এই চিন্তা যখন সবার মাথায় , তখনই রতনের ঠাম্মা লাঠি ভর দিয়ে বাড়ির ভেতর থেকে বের হয়ে এলেন। কোমরে বাতের যন্ত্রণায় হাঁটতে পারেন না তিনি , তবুও ছেলের চীৎকার কানে যেতে কোনোমতে বের হয়ে এসেছেন।

সবাই চুপ হয়ে গেল তাঁকে দেখেই ! তাঁর পাকা চুলের ছোট্ট খোঁপায় গোঁজা লাল গোলাপটা সবার নজরে পড়েছে । তিনি লজ্জা লজ্জা মুখে ছেলেকে বললেন ,

” এত চেঁচাচ্ছিস কেন ? তোর বাবার কীর্তি এটা ! আজ নাকি রোজ ডে ! তাই কাক ভোরে ঘুম থেকে উঠে সে গোলাপটা ছিঁড়ে এনে আমার খোঁপাতে গুঁজে দিয়েছে। যত সব আদিখ্যেতা ! ”

তাঁর গালের কুঁচকে যাওয়া চামড়াতেও লালের ছোপ । সবাই হাঁ করে তাকিয়ে রইল সেদিকে। পেছনে কানে কম শোনা রতনের দাদু একগাল হেসে রতনকে বললেন ,

” তোরা সবাই এখানে দেখছি ! তোর ঠাম্মাকে লাল গোলাপে কেমন মানিয়েছে বল ! সে তো জানতই না রোজ ডে কি ! ভাগ্যিস বাগানে গোলাপটা পেয়ে গেছিলাম ! ”

বাঁধানো দাঁত বের করে হাসতে লাগলেন তিনি। সাদা চুলে আলো হয়ে রইল লাল গোলাপ ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here