Home Bangla জোড়া শালিক

জোড়া শালিক

16
0

“ঊহহ ঢং! তারাতারি উঠে আয় ট্রেনে”, পায়েলের কথা শুনে ট্রেনের দেওয়াল গলিয়ে ছায়ামূর্তীর মতো ঢুকে পড়লো শুভ। পায়েল ঈশারায় কি যেন বলতেই পাশের সিটে বসে পড়লো সে। তারপর সেই অবুঝ হাঁসি “হে হে হে হে”। এই হাঁসিটাকেই তো বড্ডো ভালোবাসে পায়েল।

“খুব পাজি হয়েছিস তুই, দরজা ছাড়া ট্রেনে ঢুকবে না। তোর আবার দরজা লাগে নাকি ?”, পায়েলের কথা গুলিকে কানেই তুললো না শুভ। বরং বাচ্চাদের মতো নেতিয়ে পড়লো পায়েলের কাঁধে।

ওরা নৈহাটী থেকে ট্রেনে উঠেছে, যাবে পুরুলিয়া। পুরুলিয়াতে শুভর বাড়ি।

শুভ আর পায়েল এক বয়সের, দুজনই এবার উনিশে পা দিয়েছে। পায়েলের বাড়ি কাঁচরাপাড়ায়।

ট্রেনটা সবে বর্ধমান ঢুকেছে। ওমনি একজন পায়েলের পাশের সিটে বসতে গেছে। “একি! এখানে বসছেন কেন? চোখে কি কানা? দেখছেন না একজন বসে আছে…” এই বলেই কেমন শিথিল হয়ে গেলো পায়েলের কথা গুলো।

“ক্ষমা করবেন, প্লিজ একটু পাশের সিটটাই বসুন”, পায়েলের অনুরোধে সাড়া দিয়ে মাথা চুলকাতে চুলকাতে অন্য সিটে বসলেন ভদ্রলোক।

“লোকটার কোনো দোষ নেই, শুভ তো আর……..”, এইসব কত হাবিজাবি কথা ভাবতে লাগলো সে।

সবাই কেমন ভ্রু কুঁচকে তাকাচ্ছে পায়েলের দিকে। কারনটা সে জানে। পায়েল ছাড়া শুভকে অন্য কেউ দেখতে পায় না। অনুভবও করতে পারে না। পায়েলকে দেওয়া কথা রেখেছে শুভ, ওকে ছেড়ে যায়নি।

কথাটা ২ রা জানুয়ারী’র। আজ থেকে প্রায় বছর খানেক আগের। বাড়ির অমত থাকলেও জোর করে হোটেল ম্যানেজমেন্ট পড়ার জন্য কল্যাণীতে চলে আসে শুভ। পায়েল টোটো করেই কল্যাণীতে পৌঁছে যেতে পারে। কাঁচরাপাড়া থেকে মিনিট ১৫ ‘র রাস্তা। পায়েল, শুভর প্রেমটা ফেসবুকের। একে অপরকে এখনো অবধি সামনে থেকে দেখেনি তারা। তবে মাঝে মধ্যেই ফটো বিনিময় হয়েছে। ২ তারিখ প্রথম বার দেখা করব তারা। কতো আশা, অভিযোগ আজ খোলা আকাশে ভাসবে।

ভোর থাকতেই শুভ ট্রেনে উঠে পড়েছে। বাবা সঙ্গে আসতে চাইলেও শুভ মানা করে দেয়। কারনটা যে বেশ গোপন। কল্যাণী স্টেশনে সেই কখন থেকেই পায়েল দাড়িয়ে আছে। শুভ বলেছে হালিশহর পেরোলেই ফোন করবে সে।সময়ের আগেই কেঁপে উঠলো পায়েলের ফোন। নাম্বারটা তার চেনা। শুভই ফোন করেছে।

“হ্যাল্লো!” পায়েল বলছো?” অচেনা গলায় প্রশ্ন শুনে কাঁপা গলায় উত্তর দিলো সে, “হুম বলুন?”

“তারাতারি একবার ব্যান্ডেল আসতে পারবে খুব জরুরি”, এই বলেই চুপচাপ হয়ে গেলো শুভর নাম্বার থেকে আসা অচেনা গলাটা।

আর দেরি করলো না পায়েল, উঠে পড়লো ব্যান্ডেলের ট্রেনে। ঘন্টা খানেক লাগলো পৌছাতে। পৌছেই ফোন ঘোরালো শুভর নাম্বারে। কিন্তু কই শুভ তো ফোন তুলছে না? শেষমেষ আবার সেই অচেনা গলায় ফোনের নিরবতা কাটলো।

“টিকিট কাউন্টারের পাশে লাল রঙের একটা অফিস আছে, সেখানেই চলে আসো।”, শুভর কথা জানার চেষ্টা করতে যাচ্ছিলো পায়েল কিন্তু তার আগেই কেটে গিয়েছে ফোনটা।

পায়েল দৌড়ে পৌছালো সে অফিসে। অনেক ভীড় সেখানে। কিসব যেন হচ্ছে।

পায়েল ভাবছে, শুভকে হয়তো টি.টি ‘তে ধরেছে।

মিনিট কয়েকপর কজন বেরিয়ে এলেন ভীড় ঠেলে। সবাইকে সরে দাড়াতে বলছিলেন তারা। সবাই সরে দাড়াতেই প্রায় ২১ খানা জলজান্ত মানুষকে বের করে নিয়ে আসা হলো। যেন কি সুখে ঘুমোচ্ছে তারা। ২১ জনের ভীড়ে শুভর লাল জামাটা চিনতে অসুবিধা হলো না পায়েলের। অনেকবার ফটোতে শুভর গায়ে এই জামাটা দেখেছে সে।

কি দারুণ ভাবে শুয়ে আছে শুভ, যেন হাসছে আর বলছে “আমি এরকমই”।

রাগ হলেই শুভ মাঝে মধ্যেই বলতো, “দেখবি একদিন চলে যাবো সেদিন বুঝবি। পারলে আমার মা, বাবাকে দেখিস।

শুভর এই কতটা আজও মাঝেমধ্যে বেজে ওঠে পায়েলের কানে। তাই সময় পেলেই শুভর বাড়ি গিয়ে ওর মা, বাবাকে দেখে আসে সে। শুভর মা, বাবাকে সব কিছুই খুলে বলেছে। পায়েলের বাড়িতেও জানাজানি হয়েছে।

কিন্ত শুভ কথার খেলাপ করেনি, সেদিন আসার পথে ব্যান্ডেল লাইনে উল্টে যায় শুভর ট্রেন। সে মরে গেছে ঠিকই কিন্তু পায়েলকে ছেড়ে যায়নি। পায়েলের সাথে সব সময় থাকে সে।

পায়েলও আর কাঁদে না। সে তো শুভকে দেখতেও পায় আর ছুতেও পারে। এখন চাইলেই শুভকে নিজের হাতে খাইয়ে দেয়।
তারা তো এরকমই, ঠিক যেন জোড়া শালিক।।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here