Home Bangla তিন তালাকের পর

তিন তালাকের পর

144
0

স্কুলে তখন টিফিন চলছে। বাইরে মিড ডে মিলের শোরগোল। “আসব ম্যাডাম?” বলে একটি মেয়ে ভিতরে ঢুকল। ঢ্যাঙা লম্বা, আবলুস কালো। এই স্কুলেরই প্রাক্তনী জাহানারা খাতুন, ওহ এখন বোধহয় বেগম হবে। বললাম “আয় আয়, ভেতরে আয়। কি খবর? কেমন আছিস?” অল্প হেসে বলল “আমি ভালো আছি”। তারপর একটু চুপ করে থেকে নিচু গলায় বলল “আর্জিনা ফিরে এসেছে। অবস্থা খুব খারাপ। হয়ত আর বাঁচবে না। আপনাকে একবার দেখতে চেয়েছে। আপনি যাবেন ম্যাডাম?’ এক নিঃশ্বাসে অনেকগুলো প্রশ্ন করে গেলাম। সংক্ষেপে ঘটনাটা জানার পর ঠিক হল স্কুল ছুটির পর জাহানারা আসবে আমায় নিয়ে যেতে। বাড়িতে ফোন করে বলে দিলাম আমার ফিরতে দেরি হবে। পুরনো সহকর্মীদেরও কিছু জানালাম না এই মুহূর্তে।

ঘরবাড়ির অবস্থা ভালোই। চট্টাবাজারে জিন্সের কারখানা ওর বাবার। এছাড়াও প্রচুর জমিজমা আছে, চাষবাস হয়। কোনো জিনিসের অভাব নেই। ভেতরে ঢুকলে মনে হবে না দক্ষিণ ২৪ পরগনার কোনো গ্রামের বাড়িতে ঢুকলাম। বিকেলে তখন ওর বাবা দাদারা কেউ বাড়ি নেই। “আসুন ম্যাডাম” বলে জাহানারা আমায় একটা ঘরে নিয়ে গেল। যে মেয়েটা, বা বলা ভালো যে দেহটা বিছানার সাথে প্রায় মিশে পড়ে আছে, বলে না দিলে চিনতেও পারতাম না এই আমাদের আর্জিনা। কালো হলেও মুখশ্রী খুবই সুন্দর ছিল, চেহারাও লম্বা চওড়া। বড় বড় চোখ, হাসলে গালে টোল পড়ত। এই আর্জিনা বেগমের হারগিলে চেহারা, চোখগুলো কোটরগত। সারা গায়ে অজস্র কাটা, পোড়া আর কালশিটের দাগ। ঠোঁটের কোনে তখনও রক্ত জমাট বেঁধে আছে। স্বামীর ভালোবাসা আর সুখী দাম্পত্যের প্রমাণের কোনো অভাব নেই।

জাহানারা খাতুন, আর্জিনা খাতুন আর সুমনা মন্ডল, এরা তিনজন ছিল হরিহর আত্মা। আমি তখন সদ্য জয়েন করেছি। ওরাই ছিল আমার প্রথম ব্যাচ। জাহানারা আর সুমনার কোনোদিনই পড়াশুনোয় মন ছিল না। এদের মধ্যে ব্যতিক্রমী ছিল আর্জিনা। বিশেষ মেধাবী না হলেও অধ্যবসায় ছিল মেয়েটার। আর তেমনি দায়িত্ত্ববোধ। আমি ওকে মনিটর করেছিলাম। ক্লাস এইটে পড়াকালীন হটাৎ কিছুদিন ধরে সুমনা অনুপস্থিত। খোঁজ করতে ফিসফিস করে উত্তর পেলাম মেয়ে প্রেম করছে খবর পেয়ে বাড়ির লোক স্কুলে আসা বন্ধ করে দিয়েছে। আরেকটা জীবনের এখানেই ইতি। আমি ততদিনে এই ব্যাপারগুলোর সঙ্গে অনেকটা অভ্যস্ত হয়ে গেছি। হটাৎ করে স্কুল ছেড়ে দেওয়া, বিশেষ করে মেয়েদের, তারপর খবর পাওয়া অমুক মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে বা অমুক ছেলে কোথায় কাজে লেগে গেছে। জাহানারারাও মাধ্যমিকের আগেই বিয়ে হয়ে যায়। কাছেই থাকে। তবু স্কুলে আর এল না, মাধ্যমিকটাও দিল না।

চোখ খুলল বটে আর্জিনা কিন্তু চোখে যেন কোনো দৃষ্টিশক্তি নেই। মাথার পাশে মা আর ঠাকুমা বসে আছে। মায়ের কোলে ওর দুবছরের শিশুপুত্র ইসমাইল। বেশ মিষ্টি দেখতে, দিদার কোলে বসে খেলছে। বাড়ির সঙ্গে প্রায় যুদ্ধ করেই উচ্চ মাধ্যমিকটা দিয়েছিল আর্জিনা। রেজাল্ট বেরনো পর্যন্ত তর সয় নি বাড়ির লোকের। বিয়ে দিয়ে দিল মেয়েটার। অত্যন্ত সুপাত্র, মুম্বাইতে জাভেরী বাজারে সোনার কাজ করে, ভালো রোজগার। তারপরের গল্প সেই চেনা ছকের। মারধোর, গালিগালাজ, বছর না ঘুরতেই বাচ্চা। খেতে পর্যন্ত দিত না পেটভরে। দুধের শিশুকে বাড়িতে একা রেখে অচেনা শহরে কাজ খুঁজতে বেরনোর সাহস হয়নি আর্জিনার। এইভাবেই দিন কাটছিল। হটাৎ কদিন আগে সামান্য ব্যাপারে ঝগড়াঝাটি করে বউকে তিন তালাক দিয়ে আর্জিনার স্বামী পাড়ি দেয় সৌদিতে।

কোনোমতে কিছু টাকা জোগাড় করে আর স্থানীয় কিছু লোকের সহায়তায় ট্রেনের জেনারেল কম্পার্টমেন্টে অতিকষ্টে মুম্বাই থেকে হাওড়া এসে পৌঁছয় মা ছেলে। সেখান থেকে বাড়ি। বাড়ি? ওর তো আর বাড়ি নেই। তালাক হওয়া মেয়েকে আর ঘরে ঢোকাতে চান নি বশির আলী। তালাক উচ্চারণ করা মানেই তালাক। তার আবার বৈধতা, অবৈধতা কিসের? এই কলঙ্কিনী মেয়েকে ঘরে তুললে সমাজে নানা কথা হবে, বাকি মেয়েগুলোর আর বিয়ে দেওয়া যাবে না। আর্জিনা আর ইসমাইলের সেদিন কি হত জানিনা যদি না আর্জিনার ঠাকুমা সেদিন রুখে না দাঁড়াতেন। ছেলে আর বড় নাতিকে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন এই বাড়ি তার নামে আর এই বাড়ি থেকে তার নাতনিকে কেউ তাড়াতে পারবে না। সবকথা শুনে ওই অশিক্ষিত, গ্রামীন, মুসলমান বৃদ্ধার সাহস আর মানবিকতাকে কুর্নিশ না করে পারি নি।

আর্জিনা নিজেও বোঝেনি ও আবার প্রেগনেন্ট। ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী নাকি কোনো অন্তঃসত্ত্বা মহিলাকে তালাক দেওয়া যায় না। অবশ্য প্রেগনেন্সির খবরটা জানলেও ওর বর কতটা মানবিক হত সন্দেহ আছে। মেয়েদের বিরুদ্ধে ধর্মকে ইচ্ছামত ব্যবহার করাটাই এদের স্বভাবে পরিণত হয়ে গেছে। যাকগে, সে শিশু অবশ্য পৃথিবীর আলো দেখতে পায়নি। দীর্ঘদিনের অনাহার, অপুষ্টি, এনিমিয়া, তার ওপর শারীরিক আর মানসিক নির্যাতন। মিসক্যারেজ তো হওয়ারই ছিল। শুধু তাই নয়, আর্জিনার রীতিমত প্রাণ সংশয় দেখা গেছিল। সেইসময় নিয়মিত ওর বাড়িতে বা হাসপাতালে যাতায়াত করেছি। এই চিকিৎসার সমস্ত খরচ চালিয়েছেন আর্জিনার ঠাকুমা। নিজের চাষের ভাগের টাকা থেকে আর গয়না বিক্রি করে। পন করেছিলেন ছেলের থেকে এক পয়সাও নেবেন না। সরাসরি টাকা দিতে গেলে অপমানিত বোধ করতে পারেন তাই মাঝে মাঝে আমি ওষুধপত্র বা আনুষঙ্গিকের কিছু খরচা করতাম। তাতে অবশ্য বৃদ্ধা আপত্তি করেন নি। দীর্ঘদিন লেগেছিল আর্জিনার সুস্থ হতে। তারপর পঞ্চায়েতের সাহায্যে আমাদেরই স্কুলের মিড ডে মিলের গ্রূপে ওকে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। দিনের বেলায় কাজ করত আর সাথে সাথে ইভিনিং কলেজে পড়াশুনো। এই চারিত্রিক দৃঢ়তা বোধহয় ও ঠাকুমার থেকেই পেয়েছিল।

বেশ কয়েকবছর পরের কথা। ছুটির বেল পড়ে গেছে। বাড়ি যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি। হটাৎ আর্জিনা হাসি হাসি মুখে সামনে এসে দাঁড়ালো। ও এর এখন আমাদের স্কুলে মিড ডে মিলের কাজ করে না। টেট আর প্রাইমারির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ও এখন সরকারি প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষিকা। ছেলেকেও ওই স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছে। ঠাকুমার বাড়িতেই থাকে তবে ঘর ভাড়া দিয়ে। নাতনির সম্মানের কথা ভেবে ঠাকুমা আপত্তি করেন নি। “কি ব্যাপার রে? এত হাসি কিসের?” আমি জিজ্ঞেস করলাম। “সরফরাজ ফিরে এসেছে। সৌদি থেকে অনেক কামিয়ে এনেছে, এবার থেকে নাকি কলকাতায় থাকবে। আমায় বলছে ওর সাথে আবার নিকাহ করতে। আমাদের ধর্মে নাকি সে সুযোগ আছে”। মুখে বললাম “ভালোই তো, ঘর সংসার কর। তবে চাকরিটা ছাড়িস না”। মনে মনে শঙ্কিত হলাম “এত কষ্ট করে দাঁড় করানো একটা জীবন আবার নষ্ট হয়ে যাবে না তো”? আমি আর কথা বাড়ালাম না, এগোনোর পা বাড়ালাম। অমনি ও দৌড়ে এসে সামনে দাঁড়াল “ম্যাডাম আমার উত্তরটা শুনে যাও”। বললাম “বল”। আর্জিনা বলল “আমি বললাম তুই আমায় আবার কি নিকাহ করবি রে? তুই আমার যোগ্য নোস। আর তোকে আমার প্রয়োজনও নেই। আমি চাকরি করে আমার ছেলেকে মানুষ করব। হ্যাঁ মানুষ, হিন্দুও নয়, মুসলমানও নয়, মানুষ তৈরি করব আমি আমার ছেলেকে”। আমি আর এগোতে পারলাম না। আর্জিনাকে বুকে জড়িয়ে ঝরঝর করে কেঁদে ফেললাম।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here