Home Bangla পরিপূরক

পরিপূরক

23
0
poripurok
poripurok

আর এইভাবে কতদিন যন্ত্রণার শিকার হতে হবে জানিনা। খুব কষ্ট হচ্ছে। ছেলেটার দিকে আর তাকানো যাচ্ছে না। আমার অভিশপ্ত জীবনের সাথে ওর জীবনটাও জড়িয়ে গেল। কবে যে ছেলেটা এর থেকে মুক্তি পাবে। না আরেকটু সহ্য করে চুপ করে মরার মত পড়ে থাকি। এমনিতেই অফিসের কাজের এতচাপ তারপর আমার শরীরের কথা চিন্তা করলে ওর আর ঘুম আসবে না।ও একটু ঘুমাক। একটু আগে তো ওষুধ খেয়েছি ঠিক কমে যাবে। মনে মনে এই সমস্ত কথা কল্পনা করতে করতে দিশা ঘুমানোর চেষ্টা করে। দিশা এ্যাডিনোমায়োসিসের শিকার। মাসের ওই দিন গুলোতে ওকে অসহ্য যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়। একটা বাচ্চা না হওয়া অবধি কিছুই করার নেই ডাক্তারের মতে। যদিও দীর্ঘদিন চিকিৎসার ফলে যন্ত্রণার তীব্রতা একটু কমেছে। তবু ওর কষ্ট দেখে যখন নীতিন কাতর হয়, সেটা আরও যন্ত্রণাদায়ক হয়ে ওঠে দিশার কাছে।

পাশ ফিরে ঘুমে আচ্ছন্ন দিশার দিকে তাকিয়ে নীতিন মনে মনে ভাবে, হে ভগবান! মেয়েটার এই কষ্ট থেকে ওকে মুক্তি দাও। ক’বছর ধরে শুধু একটা সন্তানের জন্য দিনের পর দিন এই কষ্ট সহ্য করে যাচ্ছে। শুধু আমার কথা ভেবে। আমি কতবার বলেছি আমি তোমাকে সুস্থ দেখতে চাই, আমার আর কিছু চাই না। কে শোনে কার কথা। ডাক্তারের মুখে যবে থেকে শুনেছে এর প্রতিকার একটা সন্তান আসলেই কিছুটা হলেও সম্ভব। অন্যথায় যন্ত্রণা থেকে সাময়িক মুক্তি পেতে মেডিসিন খেয়ে কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখলেও, যদি ইনজেকশন বা অন্য উপায়ের ব্যবস্থা করা হয় তাহলে ধীরে ধীরে সন্তান ধারণের ক্ষমতার সুযোগ কমের দিকে এগোবে। সেই থেকে ওর জেদ ও ওর শেষ শক্তি দিয়ে হলেও লড়াই করবে। ওর বক্তব্য ‘আমি তো সারামাস অসুস্থ থাকছি না, মাত্র দু একটা দিন কষ্ট করে যদি একজনকে পৃথিবীর আলো দেখাতে পারি, তাহলে কেন তা করব না। আর তুমি তো পাশে আছো, আমি ঠিক পারব।’ ওর এই দৃঢ় প্রতিজ্ঞ মনোভাবের জন্য আমিও বারবার মাথা নত করি। কিন্তু খুব ভয় হয় যদি ও হেরে যায় ওকে সামলাতে পারব তো! এইসব কথা ভাবতে ভাবতে নীতিন ঘুমন্ত দিশার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ওর কপালে একটা চুম্বন করে। আসলে নীতিন দিশার সামনে যতই শক্ত থাকার ভাণ করুক না কেন, দিশার এই করুণ মুখটা দেখে ওর ভেতরটা তোলপাড় করতে থাকে। খুব অসহায় মনে হয় নিজেকে। ইচ্ছা করে সমস্ত শক্তি দিয়ে দিশাকে খুশি রাখতে। কিন্তু ওরা দুজনেই বড্ড নিরুপায়।

আজ সকাল থেকেই দিশাকে বেশ ফ্রেশ লাগছে। সকাল হতেই আপন মনে গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে নীতিনের জন্য ব্রেকফাস্ট বানাচ্ছে। দিশার এই হাসি খুশি মুখটা দেখতেই নীতিন সব সময় চায়। দুদিন আগের কথা কল্পনা করলেও নীতিনের গা শিউরে ওঠে। সত্যি ভগবান কি অসীম ক্ষমতা দিয়ে নারীকে সৃষ্টি করেছেন। আমার সামান্য মাথার যন্ত্রণায় কেমন কাতর হয়ে পড়ি। ও কি করে অতো যন্ত্রণা সহ্য করতে পারে জানি না। এই সদা হাস্যময়ী দিশাকে দেখে কে বুঝবে দুদিন আগে ও কি কষ্টটাই না পেয়েছে! এই সব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে ব্রেকফাস্ট সেরে নীতিন অফিসের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। যাওয়ার আগে দিশাকে বলে যায়, “শোনো ক’দিন যা গেল তোমার উপর দিয়ে, আজ আর বেশি ধকল নিও না। হালকা কিছু রান্না করে খেয়ে সারাদিন রেস্ট কোরো।”

আজ ফুরফুরে মেজাজে নীতিন ঝটপট কাজ সেরে নিল। অফিস থেকে বেরিয়ে আসতে আসতে ভাবল, বৌটা আমার খুব ফুচকা খেতে ভালোবাসে, আজ ওর জন্য কিছু খাট্টা মিঠা ফুচকা বানিয়ে নিয়ে যাই। মেয়েটার কোনো চাহিদা নেই। কি অল্পতেই খুশি হয়। রাস্তায় এসে ফুচকাওলার পাশে দাঁড়াতেই সে বলে ওঠে, “ভাইয়া, ভাবিকে লিয়ে খাট্টা – মিঠা দু কেয়্যা?” নীতিন সহাস্যে উত্তর দেয়, “হ্যাঁ ভাইয়া..।”

এদিকে রান্না করতে করতে দিশা ভাবল, ক’দিন ঠিক ঠাক রান্না করা হয়নি। ও মটর সিদ্ধ দিয়ে মুড়ি মাখা খেতে খুব ভালোবাসে, মটর ভিজিয়ে রাখি। বিকাল হতেই দিশা মটর সিদ্ধ করে, পেঁয়াজ, কাঁচালঙ্কা, শশা, টমেটো সব কুচিয়ে রেডি করে রাখে। নীতিন আসলেই আচারের তেল, নুন আর চানাচুর দিয়ে মুড়ি মেখে দেবে।

দরজার আওয়াজ হতেই সারপ্রাইজ দেবে বলে দিশা খুশি মনে দরজা খোলে। অপরদিকে আরেকজনও সারপ্রাইজ দেবে বলে হাতটা পেছনের থেকে সামনের দিকে এনে বলে, “লি জিয়ে ম্যাডাম আপকা খাট্ট – মিঠা।”
দিশা অবাক হয়ে বলে, “যা ব্বাবা! আমি চুপিচুপি সারপ্রাইজ দেব ভাবলাম ওদিকে উনিও চুপিচুপি আমাকে না জিজ্ঞেস করে এসব এনেছেন।”
নীতিন হা হা করে হেসে বলে ওঠে, “কি সারপ্রাইজ গো? মটর সিদ্ধর গন্ধ আসছে, মুড়ি মাখার সরঞ্জাম রেডি করে রেখেছো নিশ্চয়ই!”
“হি হি হি… আপনি ঠিকই ধরেছেন। আচ্ছা তোমাকে লুকিয়ে কিছু করতে পারি না কেন বলোতো? সবই তুমি বুঝে যাও। আর কখন আমার কি খেতে ইচ্ছে করছে সেটাই বা কেমন করে বোঝো তুমি?”
“ঠিক যেমন করে তুমি বুঝতে পারো আমার মটর সিদ্ধ দিয়ে মুড়ি মাখা খেতে ইচ্ছা করছে। আসলে আমরা তো একে অপরের পরিপূরক তাই না!” নীতিন কাঁধে মাথা রেখে দিশা বলে, “হ্যাঁ গো এটা একদম ঠিক বলেছো।”

দিশা আর নীতিন মতো কত পরিপূরক ভালোবাসা চারিদিকে ছড়িয়ে আছে। যারা তাদের জীবন সংগ্রামের পাশাপাশি একে অপরের সুখ দুঃখকে ভাগ করে নিয়েছে। তারা যথার্থ অর্থে হয়ে উঠেছে একে অপরের পরিপূরক।

(শেষ)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here