Home Bangla বিরিয়ানি আর চিলি চিকেন এর গল্পো

বিরিয়ানি আর চিলি চিকেন এর গল্পো

282
0
বিরিয়ানি আর চিলি চিকেন এর গল্পো
বিরিয়ানি আর চিলি চিকেন এর গল্পো

তিতির, আমার গল্পের হিরোইন হলেও ওর ফিগারটা মোটেও করিনা কাপুর বা বিপাশা বসুর মতন না…ওকে দেখতে অনেকটা বিদ্যা বালান এর মতন …. গোলগাল চেহারার সাথে একটা মিষ্টি মুখ… অনেকটা ভেতো বাঙালি টাইপ এর.!,…. তবে সেই নিয়ে তিতিরের যে খুব মাথা ব্যথা ছিল তা না !… আসলে খেতে ও খুবই ভালবাসে..সেই ছোট থেকেই!.. ফিস ফিঙ্গার, চিকেন রোল থেকে মিষ্টি দই, লড চমচম যেন ওর জীবন.!…. ওর লাইফ এর একটাই মূলমন্ত্র, “জিভে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর..”………..আর তাছাড়া বাঙালি হয়েছেই বা কি করতে যদি একটু খাওয়ার শখ না থাকে তো !..কখনো কন্টিনেন্টাল তো কখনো দেশি মুরগির ঝোল , এই তো বাঙালির জীবন |

যাই হোক চিকেন বিরিয়ানি, ফ্রাইড রাইস এর সাথে ওর রেলাসনশিপটা এতদিন বেশ ভালোই চলছিল!… কিন্তু হঠাৎই তাল কাটলো.. যেইদিন প্রথম রাহুলকে দেখল অফিস এ, সেইদিন…হাইট প্রায় ৬ ফুট হবে!, চুলটা ব্যাকব্রাশ করে আচড়ানো, মুখটা বেশ মিষ্টি, আর সব শেষে, চেহারাটা পুরো ঋত্বিক রোশন এর মতন !… অফিস এ এখন হট টপিক এই একজনই.. রাহুল মিত্র … তো এই মিত্রর সাথে মিত্রতা করার জন্য অন্যদের মতন তিতিরও পাগল!.. যদিও সবার সামনে নিজের এক্সসাইটমেন্টটা দেখায় না!.. কিন্তু মনে মনে তো পুরো প্রেমে হাবু ডুবু খাচ্ছে!.. ছেলের ব্যাপারে ফেসবুক থেকে সব ইনফরমেসন ও বার করেছে…ছোট থেকে দিল্লিতেই থাকতো না কি !.ওখানেই পড়াশোনা ,কলেজ … এখন চাকরিসুত্রে কলকাতানিবাসী… কিন্তু এতগুলো ভালো কথার মধ্যে একটাই খারাপ কথা হলো যে ফেসবুকে রাহুলের এক্স গার্লফ্রেন্ড কে দেখে তিতিরের চোখ কপালে উঠেছে!… এ মেয়ে তো সত্যিই হিরোইন.. পুরো জিরো ফিগার…. আবার মডেলিং করে.. যার এক্স এত ব্যাপক ছিল সে নিশ্চয় তার প্রেসেন্ট এ অসাধারণ কিছুই চাইবে…. আর এখানেই তিতিরের প্রেমের নৌকো জলে ডুবে যায় !… ও তো মোটা !. ওর সাথে প্রেম করা তো দুরে থাক, রাহুল হয়ত তাকাবেও না!….সেই সব ভেবেই দিন গুলো কাটছিল..! কিন্তু সেইদিন একটা ঘটনা ঘটলো….. রাহুলের কম্পিউটার এ ভাইরাস ঢুকে ওর প্রেসেন্টেশন টা কে উড়িয়ে দিল..! হাতে মাত্র আর একদিন..তারপরই প্রেসেন্টেশন জমা দিতে হবে !… রাহুলের তো মাথায় হাত….. তিতির সেইদিন রাহুলের জীবনে এন্টি ভাইরাসের কাজ করলো… মানে তিতির নিজে থেকেই ওর সামনে গিয়ে বলল, ” ডোন্ট অরি .. আমি হেল্প করব.. একদিনে প্রেসেন্টেশন তৈরী হয়ে যাবে”….. সেই দিন ওরা রাত জেগে কাজ করেছিল… রাতের ফাঁকা অফিস, কফি কাপের উষ্ণতা , আর ল্যাপটপের এইচ.টি.এম.এল কোডিং গুলো ওদের দুটো মন কে অনেকটাই এক করে দিয়েছিল………. পরের দিনের সকালটা শুরু হয়েছিল ওদের বন্ধুত্ব দিয়ে…. এই সব হয়ে তিন মাস কেটে গেছে… এখন ঋত্বিক রোশন আর বিদ্যা বালান প্রেম করে… সেইদিনের পর থেকেই ওদের এক্সট্রা কথা, এক্সট্রা দেখা শুরু হয়ে গিয়েছিল… আর সেই প্রেসেন্টেশন দেখিয়ে রাহুল এর একটা প্রমোশন ও হয়েছিল… তাই সবটা মিলিয়েই ওদের প্রেমটা জমে ক্ষীর…… কিন্তু সমষ্যা একটাই.. তিতিরের ওয়েট.. রাহুল সকালে উঠে দু ঘন্টা জিম করে প্রোটিন সেক খাওয়া পাবলিক.. আর তিতির সকাল ৯ টা অব্দি ঘুমিয়ে কফি উইথ ক্রিম বিস্কুট খাওয়া মেয়ে… আর বয়ফ্রেন্ড হিসেবে রাহুলের একটাই দাবি, তিতিরের একটা পারফেক্ট ফিগার… সেই জন্য রাহুল ওকে নিয়ে ডিয়েটেশিয়ান থেকে জিম সব জায়গায়ই একবার করে ঘুরিয়ে এনেছে…. দেখা হলেই বার বার একটা কথাই বলে, “এই শাড়িতে তোমাকে আরো ভালো লাগত, যদি তোমার ওয়েট টা আরো দশ কেজি কমে যেত !..”………. বা ” এই পিঙ্ক, হোয়াইট এর মতন হালকা কলর প্লিজ পোরো না বেবি..তোমাকে আরো মোটা লাগবে !..”………. কার কাহাতক কত দিন আর এই সব কথা শুনতে ভালো লাগে !… তার মধ্যে ওদের অফিস এর সুন্দরী সুন্দরী মেয়েদের তো রাহুলের ওপর নজর আছেই!… বলা তো যায় না, যে কখনো ওকে ছেড়ে দিয়ে রাহুল কেটে পড়ল !.. তাই ও এখন একটা ডিসিশন নিয়েছে.. রোগা হওয়ার ডিসিশন…….. ১০ কেজি ওকে কমাতেই হবে!.. যে করেই হোক.. কিন্তু ডিসিশনটা নেয়া যতটা ইজি ছিল , এখন সেটাকে সত্যি করা ততটাই টাফ… রোজ ভোর ৬ টায় উঠে দু ঘন্টা জিম.. তারপর ব্ল্যাক কফি, চিনি আর দুধ ছাড়া, তারপর গ্রিন স্যালাড, দুপুরে একটা রুটি আর টমেটো সুপ, আর রাত ৮ টার মধ্যেই ডিনার……… ভাত তো একেবারে বন্ধ, বিরিয়ানি ফ্রাইড রাইস রা এখন শুধু ওর স্বপ্নেই আসে !… বাস্তবে ওদের দিকে তাকানোও বারণ !… রাস্তার মিষ্টি, কেক এর দোকান গুলোর পাশ দিয়ে যেতে যেতে তিতিরের চোখ জলে ভরে যায়..! জীবনটা কি ছিল !, কি হয়ে গেল !…….খাওয়ার শখটা পুরো মাঠে মারা গেলো | আগে খাবারের গন্ধ নাকে আসলেই ও চুম্বকের মতন আকর্ষিত হয়ে রান্না ঘরে চলে যেত | কখনো বাসন্তী পোলাও এর গন্ধে আবার কখনো শাহী পনিরের টানে | আর আজ , রান্নাঘর থেকে ভালো ভালো খাবারের গন্ধ নাকে আসলেই নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে দিতে হয় | তরকারি যেমন নুন ছাড়া বিস্বাদ , সেই রকম বিরিয়ানি চিলি চিকেন ছাড়া ওর জীবনও বাঁশি রুটির মতন হয়ে গেছে |

এই যেমন সেইদিন ওদের অফিস কলিগ এর বিয়ে ছিল, তিতির ভেবেছিল আজকের দিনটা হয়ত একটু আলাদা হবে, বিয়ে বাড়িতে আবার কি ডায়েট!… কিন্তু কপাল… রাহুলও যে ওই বিয়েতে ইনভাইটেড !…….যেই তিতির খেতে বসলো সঙ্গে সঙ্গে রাহুল গোল গোল চোখ করে বলল, “নো বেবি, নো অয়েলি ফুড.. স্যালাড কাউন্টার থেকে আমি তোমার জন্য স্যালাড আর রায়তা নিয়ে আসছি…. টক দই খেলে ফ্যাট বার্ন হয় ভালো..”……… সেইদিন যেন তিতিরের মাথায় আগুন জ্বলে উঠেছিল !… কি মরতে এটার সাথে প্রেম করতে গিয়েছিল !.. ” বেবি এটা খাবে না !”, “বেবি ওটা পড়বে না !” , যেন ওর বাবা !…… তবে মাথাটা যখন ঠান্ডা হয় তখন ও ভাবে হয়ত সত্যি খুব ভালবাসে, তাই ওকে নিয়ে অত ভাবে !… আর কম সুন্দরী মেয়েরা তো অফিসের ঋত্বিক রোশন এর পেছনে পরে নেই !…… কিন্তু রাহুল তো কাউকে পাত্তাই দেয় না… শুধু ওকে নিয়েই বেবি বেবি করে…. এই সব ভেবেই নুন তেল ছাড়া সসা,গাজর , পেয়াজ গুলো ও চোখ বন্ধ করে চিবিয়ে নেয়………..ছোটবেলা থেকে যে খাওয়ার শখটা একটু একটু করে বড়ো হয়েছিল ওর মধ্যে , আজ সেই শখ মা এর ভোগে চলে গেছে | ওই নুন তেল মশলা ছাড়া লাইফটা এখন ভীষণ ফ্যাকাসে… হ্যাঁ, এই চার মাসে ও দশ কেজি ওজন কমিয়ে একেবারে স্লিম ট্রিম…. এখন শপিং মলে গিয়ে যা ইচ্ছা ড্রেস ও কিনতে পারে, কোমরের সাইজ নিয়ে আর বিশেষ মাথা ঘামাতে হয় না !.. কিন্তু ওর জীবনটা কেমন যেন একটা ছকে বাঁধা রোবটের মতন হয়ে গেছে… সব সময় একটাই চিন্তা, নিজেকে সুন্দরী দেখাতে হবে … এক চামচ পায়েস খাওয়ার আগেও পাঁচশ বার ভাবতে হয় যে এতে কত ক্যালরি আছে !.. আগে তো ওর জীবনটা এই রকম ছিল না… এত হিসেব করে তো ও চলত না… ওর জীবনে একটা তাল ছিল, একটা ছন্দ ছিল…. মাঝে মাঝে আয়নায় দেখে ও নিজেকে চিনতেই পারে না !… এত মেক আপ, শর্ট ড্রেস , আর একটা নকল হাসি ,এটাই এখন তিতির… সেই না বুঝে চলা, যা ইচ্ছে তাই করা, বেহিসেবি তিতির কোথায় যেন একটা হারিয়ে গেছে !.. কিছুতেই আর খুঁজে পায় না নিজেকে……..

সেইদিন সেভেনথ অক্টোবর ছিল.. তিতিরের জন্মদিন.. সন্ধ্যেবেলা রাহুলের সাথে রেস্টুরেন্ট এ যাবে…লাল রঙের একটা টপ আর তার সাথে ব্লু জিন্স … ইচ্ছে ছিল শাড়ি পরার..কিন্তু রাহুলের পছন্দ না.. যাই হোক আজকের এই স্পেশাল দিনে আর কোনো হিসেব নিকেশ না.. আজ ওর যা মনে হয় ও তাই খাবে… আজকের বার্থ ডের দিনে রাহুল মোটেও ওকে আটকাবে না কোনো ব্যাপারে… সেই সব ভাবতে ভাবতেই গার্ডেন ভিউ রেস্টুরেন্ট এ পৌঁছে গেল….. রাহুল আজ একা বসে নেই.. ওর সঙ্গে একটা চেনা মুখ… কে ওই মেয়েটা !.. রাহুলের সেই এক্স গার্লফ্রেন্ড না !…সোনিয়া…. ও আজ এখানে কি করছে !… এই সব ভেবেই এগিয়ে গেল, রাহুল নিজে যেচে পরেই আলাপ করিয়ে দিল সোনিয়ার সাথে.. ওর সাথে রিলেশন শেষ হয়ে গেলেও বন্ধুত্বটা এখনও আছে.. সে না কি রাহুলের নতুন গার্লফ্রেন্ড এর সাথে আলাপ করতে চায়..তাই আজ এসেছে…. রাহুল আজ খুব প্রাউডলি তিতিরকে যেন প্রেসেন্ট করলো সোনিয়ার সামনে… কথায় কথায় বার বার বুঝিয়ে দিলো তিতির একজন পারফেক্ট গার্ল…. আজ হঠাৎ তিতিরের মনে হলো, এত দিন ধরে কি রাহুল ওকে এই দিনটার জন্য রেডি করছিল !, ওর এক্স এর সামনে ওর প্রেসেন্ট টা কতটা অসাধারণ সেটা দেখানোর জন্য !… আজ যখন বাড়ি ফিরলো,ওর চোখ দুটো জলে ভেজা.. কেমন যেন বার বার মনে হচ্ছে ঠকে গেছে !…. রাহুল যদিও আজ খুব খুশি.. কিন্তু তিতিরের কিছু একটা শেষ হয়ে গেছে…বালকনীতে একা একা দাঁড়িয়ে এইসবই ভাবছিল… হঠাৎ সেই পুরনো চেনা গলার আওয়াজ টা কানে এলো …. ” কি রে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কি এত ভাবছিস ?”….. সুমন !…সেই স্কুল থেকে ওর বন্ধু… ও ফিরে এসেছে জার্মান থেকে !..দু বছর বাদে… কথাটা ভেবেই পাশে তাকালো… জলজ্যান্ত ছেলেটাকে দেখে ও অবাক !…”তুই ? কবে ফিরলি ? ফোন এ বললি না তো ? তোদের অফিসের প্রজেক্ট এর কাজ শেষ তাহলে !”…………. ” হ্যাঁ , ম্যাডাম,শেষ.. আর বললে সারপ্রাইস টা থাকত! কিন্তু তোকে সারপ্রাইস দিতে গিয়ে তো আমি নিজেই সারপ্রাইসড হলাম !.. শুধু তো মুখটাই এক আছে , বাকি তো সবটাই বদলে গেছে !.. এই রকম রোগা পটকা হলি কি করে !”…….. কথাটা শুনে তিতিরের মুখটা আবার গম্ভীর হয়ে গেল, “কি করে আবার ! ডায়েট করে .. জানিস আজ আমার বার্থডের মেনু কি ছিল ! চিকেন সুপ আর টক দই উইথ সসা.”…….. “ওহ, বুঝেছি, এই জন্যই তোর মুখটা বাংলার পাঁচ.. তো কে বলেছে এই সব খেতে ?”….. “আমার বয়ফ্রেন্ড , রাহুল.. তোকে তো বলেছিলাম ওর কথা ..”………”ওহ, সেই মক্কেলটা… হ্যাঁ রে, ও তো তোকে মাথা থেকে পা অব্দি চেঞ্জ করে দিয়েছে… কিন্তু তোর জন্য ও নিজে কতটা চেঞ্জ হয়েছে সেই খবর কি একবারও নিয়েছিস ?আর যদি কেউ কাউকে একচুয়ালি ভালোবাসে তাহলে সে তাকে তার মতন করে এক্সেপ্ট করবে…. তার খারাপ ভালো সবটা নিয়ে ..বুঝলি…”.,….

সেইদিন সেই প্রশ্নের কোনো উত্তর ছিল না তিতিরের কাছে !…সারাটা রাত ও জেগেছিল.. একটা কথাই বার বার কানের সামনে বাজছিল, ”রাহুল নিজে কতটা চেঞ্জ হয়েছে !”…. রাহুলের ভালো লাগা ,খারাপ লাগা অনুযাই তিতির চলে… রাহুল কি কখনো উল্টো টা ভেবেছে ! তিতিরের কোনটা পছন্দ, কোনটা অপছন্দ !…পরের দিন সকালে ঘুমটা যখন ভাঙ্গলো তখন ঘড়ির কাঁটায় ৮ টা…. মোবাইলটা পাশ থেকে নিয়েই রাহুলকে কল, “শোনো আজ দুপুর ১২ টার সময় সাউথ সিটির সামনে চলে এস..”….. আজকে রাহুলের টেস্ট.. আজ তিতির দেখবে রাহুল ওর জন্য কি করতে পারে !…সেই সব ভেবেই ও আজ রেডি হলো… আজ সেজেছে শাড়ি তে …. সঙ্গে শান্তিনিকেতন থেকে কেনা পোড়া মাটির হার, আর কানের দুল… আগে যেইভাবে সাজতো ঠিক সেইভাবে..অনেকদিন বাদে নিজেকে আয়নায় দেখে ওর খুব চেনা লাগলো ছবিটা.. অনেকদিন আগের তিতির যেন আজ ফিরে এসেছে….. ভেবেই একটা হাসি চলে এলো…..

“তুমি এই সব কি পরেছ? শাড়ি কেন ? ভাগ্গিস কাল এই সব জবরজং পরে সোনিয়ার সামনে যাওনি.. গড, আমার ইম্প্রেসনটা ই খারাপ হয়ে যেত !..”………… তিতিরকে দেখেই রাহুল এক নিঃশ্বাস এ কথা গুলো বলে দিল… তিতিরের অবাক লাগলো না.. আগে এই সব কথা নিয়ে খুব ভাবতো , কিন্তু আজকে আর ভাববে না… তাই এককথায় উত্তর দিল, “বুঝলাম..”…….. সেইদিন প্রথম তিতির নিজের পছন্দের একটা শার্ট কিনলো রাহুলের জন্য.. পিঙ্ক কলর এর… “এই শার্ট টা ট্রায়াল রুমে গিয়ে একবার পরে এসো.. পিঙ্ক কলর আমার খুব ফ্যাভারেট…”…. কথাটা শুনেই রাহুলের ভুরু দুটো কুঁচকে গেল, ” নো ওয়েজ বেবি.. আমার পিঙ্ক একটুও পছন্দ না… আমি এই শার্টটা পরবো না…”………তিতির দৃঢ় গলায় বলল, “কিন্তু আমার পছন্দ… তুমি আমার পছন্দের একটা শার্ট পড়তে পারবে না ?”……..”বেবি ইউ নো আই লাভ ইউ, কিন্তু তার মানে এই না যে আমি পিঙ্ক কলর এর শার্ট পরে বারবি ডল সেজে রাস্তায় ঘুরবো.!.. আই ডোন্ট লাইক দিস কলর …আন্ডারস্ট্যান্ড ..”… তিতির আর কিছু বললো না.. চুপ করে গেল.. প্রথম টেস্ট এ রাহুল ফেল.. …… এরপর ওরা একটা কফি সপ এ ঢুকলো, আজ প্রথম তিতির খেয়াল করলো যে রাহুল ওকে একবারও জিজ্ঞাসা না করেই অর্ডার দিয়ে দিল, “এক কাপ ফ্রেশ অরেঞ্জ জুস, আর ম্যাডাম এর জন্য গ্রিন টি..”…….. তিতিরের আসতে আসতে পারদ চরছে, ” আমার জন্য গ্রিন টি কেন বললে ? আমি গ্রিন টি খাবো না …”……..”কি হয়েছে বেবি আজ তোমার ! প্রথমে এই রকম শাড়ি টারি পরে দেখা করতে এলে, তারপর ওই অদ্ভুত পিঙ্ক শার্ট টা নিয়ে বকবক করলে, আর এখন গ্রিন টি তেও প্রবলেম… ! ইউ নো ইটস গুড ফর হেলথ ..”… কথাটা বলেই রাহুল একটা সিগারেট ধরালো… এবার তিতিরের পারদ আরো এক ধাপ চড়ল, ” হেলথ না অন্য কিছু !….. আর তুমি যে দিনে ১০ টা সিগারেট খাও, তাতে হেলথ খারাপ হয় না… !”……”বেবি, আজকালকার দিনে সবাই সিগারেট খায়.,.এটাই নরমাল..রিলাক্স …”……….” ব্যাস, অনেক হয়েছে.. বেবি বেবি বেবি.. তুমি কি আমার বাবা ? আর আমি তোমার জন্য অনেক কিছু চেঞ্জ করেছি নিজের মধ্যে.. এইবার তোমাকেও করতে হবে… তুমি আজ থেকেই সিগারেট খাওয়া ছাড়বে..নইলে আমাকে ছাড়বে .. দেখি তুমি আমাকে কতটা ভালোবাসো?”…………. রাহুল যেন আকাশ থেকে পড়ল, ” আর ইউ ওকে বেবি ? আই মিন তিতির ….. আর সিগারেট এর সাথে ভালবাসার কি কনেকশন ? সেটাই তো বুঝলাম না…আর আমি কলেজ লাইফ থেকে স্মোক করি..এটা ছাড়া ইম্পসিবেল “………. “আর আমাকে ছাড়া পসিবেল ?”…. “মানে ?”………… “মানে ভালবাসার সাথে যেমন সিগারেট এর সম্পর্ক নেই, সেই রকম শাড়ি পরলাম কি মিনি স্কার্ট ! হাই হিল, কি ফ্ল্যাট হিল ,.সেটারও সম্পর্ক নেই… কিন্তু এই সব তুমি বুঝবে না.. যাই হোক আমি আসি.. এরপর অফিসের দরকারী কথা ছাড়া আমাদের মধ্যে আর কোনো কথা থাকবে না.. তাই আমাকে কল বা মেসেজ করার কোনো চেষ্টা করবে না… এন্ড বেস্ট অফ লাক ফর ইওর ফিউচার গার্লফ্রেন্ড …”……. কথাটা বলেই তিতির উঠতে যাবে এই সময়ই ওয়েটার এক কাপ গ্রিন টি আর অরেঞ্জ জুস নিয়ে হাজির.. তিতির সঙ্গে সঙ্গে রাহুলের অরেঞ্জ জুস টা নিয়ে নিল, তারপর পাঁচ সেকেন্ড এর মধ্যে গ্লাস টা খালি করে দিল… রাহুল গোল গোল চোখ করে এখন তিতিরের দিকে তাকিয়ে বলল, “আর ইউ সিরিয়াস..তুমি আমার সাথে ব্রেক আপ করছ..”………. তিতির খালি গ্লাসটা টেবিল এ রেখে উত্তর দিল, “হ্যা,বেবি, আমি ভিষণ সিরিয়াস.. যাই হোক এনজয় দ্যা গ্রিন টি.. আর বিলটা মিটিয়ে দিও……. “………….. ব্যাস কথাটা শেষ করেই তিতির কফিশপ থেকে বেরিয়ে এলো.. আর পেছনে ফিরে তাকালো না……. আজ , এই মুহুর্তে ব্রেক আপ করে ওর একটুও দুঃখ হচ্ছে না.. বরং খুব হাসি পাচ্ছে রাহুলের ওই গোল গোল চোখ দুটোর কথা ভেবে……”জানিস, আমি ব্রেক আপ করে দিলাম… রাহুল তো স্বপ্নেও ভাবেনি যে আমি ওকে ওই ভাবে ঝাড়তে পারি..খুব চাপ খেয়ে গিয়েছিল…. “… এক গাল হেসে কথাগুলো বলে গেল তিতির সুমনকে…… সুমন খুব বিজ্ঞের মতন উত্তর দিল “তো এবার কি প্ল্যান ? আর আমি তো জানতাম ব্রেক আপ হলে লোকে কান্নাকাটি করে.. এ তো দেখি উল্টো..যাই হোক যা করেছিস ভালোই করেছিস ..ওই রকম পাবলিকের সাথে আর কিছুদিন থেকে ডায়েট করলে তোকে আর খুঁজে পাওয়া যেত না.. বাঁশের মতন টিং টিং করতিস..”……..”হ্যাঁ, আমি জানি আমি ভালোই করেছি.. আর আজ আমরা ইন্ডিপেনডেন্স ডে সেলিব্রেট করব..কে.এফ.সি তে চল..আজ আমি ট্রিট দেবো….. “…. ” ইন্ডিপেনডেন্স ডে!… কি থেকে মুক্তি পেলি আজ ? “………….তিতিরের এক কথায় উত্তর ” সসা আর টক দই থেকে গাধা..”………..

এই সবের পর ৬ মাস কেটে গেছে… এখন তিতির রাহুল কে চিনেও চেনে না, দেখেও দেখে না… রাহুল ব্রেক আপ এর পর দু চার দিন মেসেজ ,ফোন করেছিল.. তিতির রিপ্লাই করেনি… তারপর রাহুল ও আর চেষ্টা করেনি… টিনা বলে অফিস এ একটা নতুন মেয়ে জয়েন করেছে.. রাহুলের সব এটেনশন এখন তার দিকে…,, যাক, বাঁচা গেছে… তিতির আজকাল খুব খুশি থাকে.. আসলে ওর বেস্ট ফ্রেন্ড সুমন যেইদিন থেকে জার্মান থেকে ফিরেছে সেই দিন থেকেই… সেই ক্লাস ফাইভ থেকে ওরা বন্ধু… একসাথে সাইকেল করে স্কুলে যেত .. সুমন যেন ওকে গার্ড দিয়ে নিয়ে যেত, আবার নিয়ে আসতো,… কোনো ছেলে লাইন মারার সাহসই পেত না !… এই দু বছরে ও খুব মিস করেছে ওই মুহূর্ত গুলোকে.. যাক বাবা, ঘরের ছেলে এখন ঘরে ফিরেছে…. আর সুমনের সাথে সাথেই ওর জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়া খাওয়ার শখটা ও আবার ফিরে এসেছে | আজকাল সেই আগের মতন একসাথে উত্তমকুমারের সিনেমা দেখা, নিউ মার্কেট এ কেনাকাটা, ভিক্টোরিয়ার সামনে ফুচকা খাওয়া, চকলেট আইসক্রিম না কি ভ্যানিলা নিয়ে ঝগড়া সবটাই ফিরে এসেছে……….তিতির এখন রবিবারের সকাল গুলো রান্না ঘরেই কাটায়..নতুন নতুন প্রিপারেশন তৈরী করে | কখনো চিকেন তো কখনো চিংড়ি সহযোগে রোববার গুলো এখন জমজমাট |

কিন্তু সেইদিন অফিস থেকে বাড়ি ফিরেই ও একটা ব্রেকিং নিউস পেলো, সুমনের বাড়ি থেকে ওর জন্য সম্বন্ধ এসেছে… এতে মা বাবাও খুব খুশি.. ছেলে ভালো চাকরি করে, তার ওপরে এত দিনের চেনা, সুমনের বাবাও তিতিরের বাবার খুব ভালো বন্ধু.. তাই সেই বাড়িতে মেয়েকে দিতে ওদের কোনই অসুবিধা নেই… আর এর ওপরে ওর মা তো ভাবে তিতির আর সুমন প্রেম করে… এত ঘোরাঘুরি, একসাথে সময় কাটানো..এইসব তো প্রেমেরই লক্ষণ … তিতির এর কি উত্তর দেবে !.. সত্যিই তো, এত বকর বকর, ঘোরাঘুরি তো প্রেমিক প্রেমিকাই করে.. ! মা বাবা যে মনে মনে এত কিছু ভেবে নিয়েছে এটা যদি আগে জানতো !… ঘরে বসে একা একা আজ ওর অনেক কথা মনে হচ্ছিল… সত্যি ,সুমন ওর কতদিনের চেনা… সেই স্কুল থেকে… ওর জীবনের সব সিক্রেটস এই ছেলেটা জানে… ওর মনের সব কথা এই ছেলেটা শোনে…. অথচ কখনো কেউ কাউকে ওই ভাবে দেখেইনি.. প্রপস তো দুরে থাক, প্রেমের নেকা নেকা একটা লাইনও সুমন ওকে আজ অব্দি বলেনি…. তাহলে কি সুমন ওকে কখনো ওই চোখে দেখেইনি.. !কথাটা ভেবেই যেন হঠাৎ তিতিরের মনটা একটু খারাপ হয়ে গেল…. কিন্তু সুমনদের বাড়ি থেকে হঠাৎ এই সম্বন্ধের ব্যাপারটাই বা এলো কি করে !.. সুমন কি ওর মা বাবাকে ওদের ব্যাপারে কিছু বলেছে !… না, সামনাসামনি দেখা করেই সবটা ক্লিয়ার করতে হবে……

কথাগুলো ভাবার সঙ্গে সঙ্গেই তিতির বেরিয়ে পড়ল… এই ছেলেটা কাজের সময়ই ফোন ধরে না..! কতবার ট্রাই করছে !..রিং হয়ে কেটে যাচ্ছে… মনে হয় বাড়িতেই আছে… এই ভেবেই সুমনদের বাড়ির কলিং বেলটা বাজলো..সুমনের মা দরজা খুলল….. “কাকিমা সুমন কোথায় গো? ”

“আরে ও এখনো অফিস থেকে ফেরেনি.. তুই যা ,ওর ঘরে গিয়ে বোস..”………….

কে জানে সুমন কখন ফিরবে…! বাবা, ছেলে হয়েও ঘরটা কি পরিস্কার রাখে.. ! সব জিনিস একদম ঠিকঠাক জায়গায়.. সুমনের ঘরের এদিক ওদিক ঘুরতে ঘুরতে তিতির এই সব ই ভাবছিল.. কিন্তু হঠাৎ আধ খোলা ড্রয়ারটার দিকে চোখ চলে গেল ওর… তার মধ্যে একটা পিঙ্ক কলর এর ডায়রি উঁকি মারছে… বাহ, বেশ সুন্দর দেখতে তো ডায়রি টা কে … তিতির কথাটা ভেবেই ড্রয়ার টা খুলে ডায়রিটা বার করলো…. আচ্ছা এটা কি সুমনের পারসোনাল ডায়রি ? বলা তো যায় না !.. ছেলের হয়ত অনেক গোপন কথা আছে !….. দেখা যাক কি লিখেছে মিস্টার সুমন…

কিন্তু ডায়রির পাতাগুলো পড়তে পড়তে ওর মুখের হাসিটা কোথায় একটা মিলিয়ে গেল…ডায়রির প্রত্যেকটা পাতা জুড়ে শুধুই তিতিরের কথা … সেই ছোটবেলা থেকে আজ অব্দি সুমনের এত জমা কথা !… ওদের স্কুলের ফটো, কলেজের ফটো… তিতিরের দেয়া কার্ডস গুলো সব এত যত্ন করে ডায়রির পাতাগুলোতে সামলে রেখেছে সুমন !… আর তিতির এত দিন এই সব কিছুই জানতো না !… কখনো ভাবেওনি আলাদা করে সুমনের ব্যাপারে… যেই ছেলেটা ওর জন্য সব সময় ছিল, যে এত দিন ওর এত কাছে ছিল, চোখের সামনে ছিল, তাকেই দেখতে পায়নি তিতির !…….. বুঝতেই পারেনি, যে এটা ভালোবাসা…….ডায়রিটা কে বন্ধ করে তিতির আবার ড্রয়ারের ভেতরে ঢুকিয়ে রাখল… ততক্ষণে সুমন হাজির,

” আরে আই আম রিয়ালি সরি তিতির.. আমি তো জানতামই না যে মা বাবা তোদের বাড়ি সম্বন্ধ পাঠিয়েছে!… তুই একদম ভাবিস না … আমি না বলে দেব বাবা মা কে… তুই এই নিয়ে একদম টেনসন করিস না ….”…….এক নিঃশাস এ সুমন কথা গুলো বলে গেল..

তিতির ওর দিকে কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বলল, “কিন্তু আমি তো তোকে বিয়ে করবো… আমি মা বাবাকে ফোন করে দু মিনিট আগেই হ্যাঁ বলে দিয়েছি……..”…….সুমন যেন আকাশ থেকে পড়ল .. “কি? কি বলছিস ?”……”ঠিক ই বলছি… হ্যাঁ রে, তুই সেই স্কুল থেকে আজ অব্দি আমার সাথে এত ভাট বকতে পারলি… আর আসল কথা গুলো সব ডায়রিতে লিখে রাখলি..?”…….. সুমনের মুখটা এবার গম্ভীর..” তুই আমার ডায়রি পড়েছিস ?”…. ” ভাগ্গিস পড়লাম … নইলে তো তুই আমাকে স্বর্গে গিয়ে প্রপস করতিস.. এ জীবনে আর আমাদের বিয়ে করা হত না..”….. এইবার সুমন আস্তে আস্তে বললো , “আসলে আমি ভয় পেতাম.. যদি তুই না বলে দিস !.. তাই..বলিনি কিছু..”……….. এবার তিতির সুমনের পাশে বসে ওর কাঁধে মাথাটা রাখলো , সুমনের হাতটাকে শক্ত করে ধরে ওকে জিজ্ঞাসা করলো, “হ্যাঁ রে, আমাদের বিয়েতে মেন কোর্স এ কি হবে? চিকেন বিরিয়ানি আর চিকেন চাপ ? না কি চিলি চিকেন আর ফ্রাইড রাইস..”……….. সুমন আর নিজের হাসিটাকে কন্ট্রোল করতে পারলো না, তিতিরের গালটা টিপে উত্তর দিল, “আমার মাথা আর তোর মুন্ডু হবে… “…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here