Home Bangla বিহন

বিহন

22
0

কদিন ধরেই প্রেমের ধাতটা বড্ডো বেশি বেড়েছে। চোখে আর মেয়ে ছাড়া কিছুই সয় না।

না, তবে স্বভাব বিগড়ায়নি। চরিত্র এখনো গ্রামে গঞ্জের টাটকা ঘিয়ের মতোই গন্ধ ছাড়ে। প্রেম করা বা মেয়ে দেখা কোনোকিছুই আমার চোখে অন্তত কটু বলে মনে হয় না। আরে বাবা ভগবানতো মেয়েদের বানিয়েছেই পুরুষদের আকৃষ্ট করার জন্য। আমি না হয় একটু বেশিই জলঘোলা করলাম। তাতে আর দোষের কি ?

আমি আর কটা মানুষের মতো সচল নই। মানে হাত-পা সবকিছুই এখনো যথাযথই আছে। কিন্তু পাড়ার লোকজন আমাকে আলসে বামুন বলেই চেনে। জাতিতে আমি ব্রাহ্মন, সেবিষয়ে কোনো খুত নেই। তবে ওই যে বলে না কুয়োর ব্যাঙ। আমিও অল্প একটু সেরকমই। যদিও আলসেমির সবকটা শিরোপায় বাড়ির লোকের দেওয়া। এতে আমার হাত তো দূরের কথা নখ, আঙুল, পা এমনকি চুলটুকুও নেই।

আমার বাড়ির পাশেই রেল স্টেশন। স্টেশন কেবল নামেই। কাজের সময় ট্রেনের টিকিটিও এমুখো হয়না। মাঝে মধ্যে নিয়ম করে কটা মাল গাড়ি যায়। আরও একটা ট্রেন অবশ্য পেরোয় কিন্তু তখনও নিদ্রাদেবী আমার চোখ ছাড়তে চায়না। অগত্যা সেই ট্রেনের খোঁজখবর রাখা আমার রুটিংয়ে না থাকার মতোই। ৯ টার আগে আমার ঘুম ভাঙলে হয়। এজন্য মা অবশ্য রাজার বেটা বলেই ডাকে। সারাদিনের কাজ চুকিয়ে রোজ জানালার পাশে বসি। আমার ঘরে একটাই জানালা। ওখান থেকে স্টেশনে যাতায়াত করা মানুষদের ভালোমতোই চোখে পড়ে। মানুষ বলতে ওই আরকি মেয়েদের কথা বলছি। তাদের দর্শন ছাড়া দিন চলার উপায় নেই।

আমি ছোট থেকেই ঘরকুনো। তাই বন্ধুবান্ধব নেই বললেই চলে। একমাত্র বন্ধু বলতে বাড়ির এই আধখাওয়া জানালা’টা। আমার মা’ও বেশ কৌতুহলী। জানালা দিয়ে রোজ কি দেখি তা জানতে মায়ের কৌতুহল ঠান্ডা হওয়ার নাম নেয় না। প্রতিবারই প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখছি বলে ব্যাপারটা ধামাচাপা দিয়েদি। কিছু ভুল বলি বলে মনে হয় না। মেয়েদের অপরুপ গড়ন প্রকৃতির সৌন্দর্যকে কোন ভাগাড়ে ফেলে আসে। বরং মেয়েদের সাথে প্রকৃতির তুলনা না করাই ভালো।

জানালা দিয়ে প্রকৃতিকে দেখতে দেখতে কতবার যে তার প্রেমে পড়েছি, সে হিসেব হয়তো স্বয়ং ভগবানও মেলাতে পারেননি। কারও কথায় কান না দিয়ে আমিও হাল ধরেই থেকেছি। অর্থাৎ মোটের ওপর যোগফলে আরও একটি নতুন সংখ্যা জুড়ে দিয়েছি চোখ-কান বন্ধ করেই।

তবে প্রতিকটা প্রেমেরই না ছিলো কোনো মা আর না ছিলো কোনো বাপ।

আমি আর যেমনই হই না কেন চরিত্রহীন ছিলাম না। আর সবার মতো মেয়ে দেখতাম ঠিকই কিন্তু কারোর স্বভাব নিয়ে টানাটানি করিনি।

মেয়ে দেখে আর কতটুকুই বা সময় পেরোয়। তাই এই কদিন বই পড়া ধরেছিলাম। জাদু না মন্ত্রতন্ত্র ,তা কিছুই বুঝি নি। তবে হটাৎ করেই মেয়েটানের স্বভাবটা গা ঢাকা দিয়েছিলো। ভেবেছিলাম আর ওমুখো হবো না। কিন্তু সুধরাতে দিলে তো। বেশ কদিন বই নিয়ে ভালোই কাটছিলো। বাধ সেজেছিলো ব্রিটিশ আমলের ফ্যান’টা। না, ফ্যানটা ব্রিটিশ আমলে জন্মায়নি। তবে এর পাক খাওয়ার কায়দা দেখে আমি ব্রিটিশদের খরচের খাতায় সেটার নাম ফেলে দিয়েছিলাম। ঘড়ির কাঁটা তখন সবে ৬:৪৫ এর ঘর পেরিয়ে ৫০ ঘাড়ে চেপেছে। কারেন্ট গেছিলো নাকি ফ্যান তার ক্যারামতি দেখাচ্ছিলো তা এখনো বুঝে উঠতে পারছিলাম না। তাই নিয়ম করেই জানালার পাশে রাখা বেতের সরু লাঠিটা নিয়ে যেই ফ্যানে খোচা মারতে যাবো ওমনি একটা শব্দ আমার টনক নাড়িয়ে দিলো। কে যেন একটা খারাপ কথায় আমাদের স্টেশনটিকে সম্বোধন করলো। ভেবেছিলাম কান দেবো না। কিন্তু ঘুমের ঘোরটা তখনই কাটলো যখন বুঝলাম ওপরারের সম্বোধন বাক্যটি একটি মেয়ের ভাষায় বলা। যাইহোক, একবার সেই নারিকে দেখার জন্য উকি মারলাম জানালায়।

এই রে! এতো দেখি মরা গাঁয়ে ফুলের তোড়া।

কদিন আগে বইয়ে পড়েছিলাম “Love at first sight”। আমাকেও কি সেই রোগে ধরলো। যদিও এই ধাত আমার বেশ পুরোনো। তাই বুঝতে বেশি সময় নিলাম না।

মাথায় কোঁকড়ানো চুলের বাহার, গায়ে পেচিয়ে আছে শাড়ি, কপালে হলুদ রাঙা টিপ। এমনই ছিলো নুপুরের অপ্সরা সুলভ রুপ। আর নিজেকে সামলে রাখতে পারলাম না। পরক্ষণেই নিজেকে তাঁর পায়ে বিলিয়ে দিলাম।

নুপুর আমার কল্পিত নাম। একতরফা পরিচয়ে তাঁর নাম জানতে পারিনি। শুধু বুঝেছিলাম ৭ টার ট্রেনটা ধরার জন্য নুপুর স্টেশনে এসেছিলো। এতোক্ষনে তাঁর মধ্যে হারিয়ে গিয়ে আমি ফ্যানের কথাও ভুলে গেছি। এমনকি স্টেশনের উদ্দেশ্যে মুখ থেকে বেরোনো কটু সম্বোধনটাও আর আমার খেয়াল নেই। আমার ঘোর কাটলো ট্রেনের হর্ণে। ততক্ষণে নুপুর হাওয়া। না, সে মিলিয়ে যায়নি। ট্রেনের একটা কামরা থেকে নুপুরের শাড়িটা চোখে পড়েছিলো।

সেদিন ঘুম তাড়াতে আর নটা বাজেনি। উঠেপড়েছিলাম মিনিট কয়েক পরেই। তবে নুপুরের ঘোর এখনো অব্যাহত। সেদিন আর জানালায় চোখ রাখতে হয়নি। মনটাও বই নিয়ে ব্যস্ত হতে চাইছিলো না। চাইবেই বা কেন ? আজ যে অপ্সরা দর্শন হয়েছে। সারাদিন এইভাবেই কাটলো। রাতে যদিও বা ঘুম এলো তাও আর বেশিক্ষণ টিকলো না। আজ আর ফ্যান বিগড়ায় নি। বরং আমার মনেই উথালপাথাল শুরু হয়েছিলো নুপুরের জন্য। এবারের অনুভূতি গুলো কেমন যেন। আগের সঙ্গে মিল খায় না। আমি হয়তো এবার সত্যি ভালোবেসে ফেলেছি। কিন্তু এখনো সে বিষয়ে দ্বন্দ্ব থাকায় কোনো সিদ্ধান্তে উপনিত হলাম না। চোখের কোনায় অল্প একটু ঘুম ধরতেই যাচ্ছিলো। তবে মিনিট কয়েকের মধ্যেই মোবাইলের এলার্মে তারও দফারফা হলো। ভেবেছিলাম আজকেও হয়তো নুপুর আসবে, তাই জীবনের প্রথম এলার্মটা সময়মতোই বেজেছিলো। কিন্তু কোথায় নুপুর?

না, আজ আর অপ্সরা দর্শন হলো না।

জীবনে কত মেয়ে আসবে আর কতোই বা যাবে। এই বলেই আপাতত সান্ত্বনা দিলাম নিজেকে।

আর কোনোদিন ৭ টায় উঠিনি। ফিরে গেছি আগের রুটিংয়েই।

সেদিনও মনের সুখে ঘুমোতাম যদি না জানলা দিয়ে বৃষ্টি ছিটেফোটা এসে আমাকে জ্বালাতো। এসময় তো বৃষ্টি নামার নয়। তাহলে কি আবার সেই বর্ষার পেচপেচে দিন ? আর বেশি গভীরে না গিয়ে জানলার ছিটকিনিটা লাগানোর ব্যবস্থা করছিলাম। ঠিক কখন জানিনা আবার সেই চেনা মুখের প্রতিফলন পড়লো আমার চোখে। প্রথমে মনের ভুল ভেবেছিলাম। কিন্তু আমার চোখ যা চায় তাকে কি ভাবে ভুল দেখে। হ্যাঁ, আজও নুপুর’কে দেখলাম। সেই একই সাজ, একই শাড়ি। ফারাক শুধু পিঠের কাছে। কালো একটা স্কুল ব্যাগ ঝুলছিলো নুপুরের পিঠে। সেখানে বড়ো বড়ো সাদা অক্ষরের লেখা গুলো আমার চোখ এড়ায়নি। জানতে পারলাম নুপুর নার্সিং ট্রেনিং করে। জায়গাটা বেশ দূরে তাই হয়তো ফিরতে রাত হয়ে যায় নুপুরের। ততক্ষণে আমি ঘুমিয়েও পড়ি।

নুপুরকে নিয়ে আমার এক তরফা প্রেম বেশ ভালোই কাটছিলো। না ছিলো কোনো বিরক্তি আর নাই বা ছিলো ঝঞ্জাট। এতোদিনে নুপুরের প্রতি আরও দূর্বল হয়ে পড়েছিলাম। দূর্বলতার ভার এতোই যে মাঝে মধ্যে নুপুর না এলে খাওয়া দাওয়া কোন চুলোয় যে যেতো তাঁর হদিশ পেতাম না। যত দিন যাচ্ছিল আমি সাহস জমিয়ে তৈরি হচ্ছিলাম। প্রায় প্রতিদিনই ভাবতাম জীবনের প্রথম প্রেমের প্রস্তাবটা দিয়েই ফেলি। কিন্তু নুপুরের অপ্সরা সুলভ চেহারা সামনে আসতেই আমার জমানো সাহস প্রাণপণে পালাতো।

এরই মধ্যে বর্ষাও নিজের প্রলাপ দেখিয়েছে। নিয়মমাফিক সকাল থেকেই এমন একঘেয়ে বৃষ্টি নেমেছে যে তা দেখে গ্রাম বাংলার জলে ভরা মাঠঘাট আর দেখতে ভালো লাগে না। নুপুর আজও এসেছে। তেমন বেশি দূর্যোগ না হলে নুপুর কামাই করে না। এই কদিনে যা চিনেছি তাই ঢের। রোজকার মতো আজকেও যে মনের কথা বলার চেষ্টা করিনি তা নয়। কিন্তু ….না থাক, প্রতিবার নিজের ব্যর্থতার পরিচয় না দেওয়ায় ভালো। কিসব হাবিজাবি ভাবতে ভাবতে হটাৎ করেই চোখের সামনে থেকে নুপুর উধাও। বুঝলাম ট্রেনের সময় হয়ে গেছে। তারপর আর কি? আমিও ব্যস্ত হয়ে পড়লাম নিজের আজগুবি দেশে। ওদিকে সন্ধ্যে নেমেছে। এর মানেই আমার স্টেশন যাওয়ার সময়। একটা কথা বলে ওঠা হয়নি। আমি ধুমপান করি। নিয়মকরে রোজ একটা সিগারেট আমার খাওয়া চায়। মা, বাবার চোখ এড়িয়ে স্টেশনে রোজই যেতাম এজন্য। কোনোদিনো অবশ্য ধরা পড়িনি। আজকেও বেশ দম নিয়ে একটা সুখটান দিচ্ছিলাম। ওমনি কারা যেন দল বেধে কি একটা আসার গল্প করছিলো। অগত্যা আমিও যোগদিলাম। শুনলাম আহিরীটোলা প্যাসেঞ্জার নাকি লাইন ভেঙে পড়েছে। তেমন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি তবে কজন মারাও গেছে। আমার কৌতুহল বাড়লো। মৃত দেহ নাকি একটু পরেই নিয়ে আসা হবে। কৌতুহলে ধৈর্য্য চাপিয়ে আমিও তীর্থের কাকের মতো দাড়িয়ে রইলাম। না, তবে বেশিক্ষণ দাড়াতে হয়নি। সাদা পলিথিনে মোড়া চারটি মৃত দেহ সারি সারি ভাবে সাজানো। লোকের ভিড় একরকম উপচে পড়েছিলো তাই আরও মিনিট কয়েক অপেক্ষা করলাম। সবাই প্রায় সান্ত্বনার ভঙ্গিতে গল্পগুজব শুরু করেছিলো। এবার আর তাদের দলে যোগ দিই নি। বরং স্বচক্ষে দেখতেই এগিয়ে গেলাম। একে একে প্রায় সবকটাই দেখতে যাচ্ছিলাম। এক, দুই, তিন… না, চার নম্বরটা আর দেখা হয়নি। কারণ তিন নাম্বারে নুপুর নিথর ভাবে শুয়ে ছিলো। এখনো দেহ বিগড়ায়নি। যেন এক ঘুমন্ত অপ্সরা। মাথার কাছে অল্প রক্তের ছিটেফোটা আর পাশেই কি যেন একটা ঝুলছে। সাহস করে হাত বাড়ালাম। একটা আই কার্ড পেচানো ছিলো নুপুরের গলায়। তাতে মোটা অক্ষরে লিখা শ্রুতি মজুমদার। বাকিটুকু পড়ার ইচ্ছে বা মনোভাব কিছুই ছিলো না।

বুঝেছিলাম আমার কল্পনার নাম আজ কল্পনাতেই ফিরে গেছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here