Home Bangla ভূতনাথ ভূততাড়ণ কোম্পানী

ভূতনাথ ভূততাড়ণ কোম্পানী

195
0
ভূতনাথ

ঝাঁ-চকচকে অফিসঘরটায় বসে মিঃ ভূতনাথ সমাদ্দার হাতের আই-ফোনের নোটপ্যাডে আজকের অ্যাপয়েন্টমেন্টের ডিটেলটায় চোখ বোলালেন। ক্লায়েন্ট শাঁসালো ব্যবসায়ী।

বেশ কিছুদিন ধরেই স্টাডি করে জাল বিছিয়েছেন। আজ জাল গুটোনোর পালা। ক্লাইম্যাক্স!

ঠিকঠাক উতরে গেলে যা দক্ষিণা নেবেন তাইতে ব্যাঙ্কের বইটার ওজন ভালোই বৃদ্ধি পাবে।

কালো ব্যাগটা হাতে নিয়ে শ্যামল, ওঁর সবচেয়ে বিশ্বস্ত সাগরেদ, চেম্বারে ঢুকে ডাকল – “স্যার ! গাড়ি রেডি। বেরোবেন তো এবার? ” মিঃ ভূতনাথ উঠে দাঁড়িয়ে রিভলভিং চেয়ারটা পেছনে ঠেলে দিয়ে কোটটা হাতে নিয়ে বাইরে এসে গাড়িতে উঠলেন। ঠিক সন্ধ্যে সাতটায় ওনার কালো স্করপিও এসে থামল দক্ষিণ কলকাতার অভিজাত এলাকার বড়োলোক ব্যবসায়ী, রামলাল শর্মার প্রাসাদোপম অট্টালিকার সামনে।

এই প্রাসাদের একমাত্র রাজকন্যা বছরখানেক আগে বাবা মায়ের অমতে একটি গরীব বাড়ির ছেলেকে বিয়ে করে ঘর থেকে চলে যায়। কিন্তু দুর্ভাগ্য! ছমাস আগে হঠাৎই শ্বশুরবাড়িতে সিঁড়ি থেকে পড়ে মৃত্যু হয় মেয়েটির। ভূতনাথবাবুর শাগরেদরাই এই খবর জোগাড় করে এনেছিল তৎক্ষণাত।

এরপরের ব্লুপ্রিন্ট বানাতে আর ফাঁদ পাততে বেশি দেরী করেননি ভূতনাথ বাবু। বাড়ির এক পরিচারিকা, গীতাকে ধীরে ধীরে হাত করে ভূতনাথবাবুর আরেক শাগরেদ পল্টু। তারপর একদিন রামলাল বাবুর বাড়িতে পেস্ট কন্ট্রোলের লোক সেজে ঢোকে পল্টু তার দলবল নিয়ে। বেছেবেছে এমন সময়, যখন বাড়িতে শুধু মালিক বলতে রামলাল বাবুর স্ত্রী একা। কন্যাশোকে নিমজ্জিত সরল সাধাসিধে প্রৌড়া ভদ্রমহিলা তাঁর পরিচারিকা গীতার থেকে শোনেন পল্টু মেয়েটির পূর্বপরিচিত, তাই বিশেষ সন্দেহ করেননা।

গীতার সাহায্য নিয়ে মিনি প্রোজেক্টর, সাউন্ড সিস্টেম এবং আরো অনেক ক্ষুদ্র সূক্ষ্ম যন্ত্রপাতি ঘরের এখানে ওখানে ফিট্ করে পল্টুরা। বিশেষ করে রামলালবাবুর বেডরুমে। যন্ত্রপাতিগুলো চালানোর কলকব্জা সব গীতার জিম্মায় থাকে।

এবার ভৌতিক উপদ্রব শুরু করা হয় বাড়ির বাসিন্দাদের ওপর। গীতা যখন তখন, গভীর রাত্রে যন্ত্রগুলো চালিয়ে নানরকম শব্দ, আওয়াজ করতে থাকে। ভীত সন্ত্রস্ত দুই বৃদ্ধ বৃদ্ধা অবশেষে তান্ত্রিক, ওঝার শরণাপন্ন হ’ন। কিন্তু তাতে খুব স্বাভাবিকভাবেই কোনো ফল হয়না। তাঁদের একমাত্র ছেলেও বিদেশে ম্যানেজমেন্টের ডিগ্রির জন্য পাঠরত। সে তো হেসে উড়িয়ে দেয় বাবার কথা। আত্মীয় স্বজন সবই তাঁদের আসল মুলুক রাজস্থানে। তাই বাধ্য হয়ে পুলিশে কমপ্লেন করতে গেলে ভূতের নাম শুনে পুলিশও একচোট হেসে বিদায় জানায় রামলালবাবুকে।

বাড়ি পরিবর্তন করার কথা ভাবতে শুরু করেন বাধ্য হয়ে তিনি।

এবার শুরু হয় প্ল্যানের দ্বিতীয়ভাগ। ভূতনাথবাবুর ডানহাত শ্যামল এবার আসরে নামে। আগেই খবর জোগাড় করা ছিল যে রামলালবাবু প্রতি সপ্তাহে শনিবার মন্দিরে যান। শ্যামলও হাজির হয় আরেক ভক্তের বেশে। বিভিন্ন আছিলায় ভাব জমায় ওঁর সাথে।

রামলাল বাবুর স্বাস্থ্য নিয়ে উৎকন্ঠা প্রকাশ করে।

ক’দিন পরপর আলাপচারিতায় একটু নিশ্চিন্ত হয়ে রামলালবাবু সরল মনে নিজের সংসারের হাল-হকিকত বলতে শুরু করেন। শ্যামলও ওঁর মেয়ের মৃত্যুর খবরে সমবেদনা জানায়, ছেলের পড়াশোনার খবর নেয়। অবশেষে ভূতের উপদ্রবের কথা শ্যামলের কাছে বলে ফেলেন তিনি।

শ্যামল তো এই সুযোগটার অপেক্ষাতেই ছিল। ওমনি গপ্প ফাঁদে যে সে নিজেও নাকি এরকম ভূতুড়ে কান্ডকারখানার শিকার হয়েছিল।

ওঝা তান্ত্রিক পুলিশ কেউ কিচ্ছুটি করতে পারেনি।

শ্যামল বলে – “রামলালজী আপনি বরং একবার ‘ভূতনাথ ভূততাড়ণ কোম্পানি’-তে যোগাযোগ করুন। আমি ঠিকানা ফোন নম্বর দিচ্ছি। একমাত্র উনিই পারবেন আপনাকে বাঁচাতে।”

রামলালবাবু বলেন -“ভূত তাড়ানো কোম্পানি !! সেটা আবার কী বেওসা আছে শেমলবাবু?”

শ্যামল একগাল হেসে বলে -“আরে রামলালজী! বিশাল বড় ব্যাপার আছে। রীতিমত সায়েন্টিফিক ভাবে ভূতের ভবলীলা সাঙ্গ করেন ভূতনাথবাবু।”

-” বাব্বা! সে কি যজ্ঞটজ্ঞ কোরতে হোবে নাকি ? যা খোরচা লাগবে সোব করব। আমায় শুধু ওই ভূতোবাবুর সাথে যোগাযোগ করিয়ে দিন। আমার মিসেস তো ভেঙ্গে পড়েছে একদোম। মেয়েটা চোলে গেল এভাবে। ছেলেটা দূরে থাকে। এই অবস্থায় এরোকম ঝামেলা ঘরে। ভাবছি বাড়িটা সেলই কোরে দেব।”

শ্যামল ভাবে এই তো মছলী জালে ফেঁসেছে।

এবার নেক্সট স্টেপ।

রামলালবাবু কে নিয়ে একদিন শ্যামল হাজির হয় ভূতনাথভূততাড়ণ কোম্পানির অফিসে। অন্যান্য অপারেশনগুলোর মত এটাও প্ল্যানমাফিক এগোতে থাকে।

ভূতনাথবাবুর পার্সোনালিটি, প্যারানর্মাল অ্যাকটিভিটির ওপর পি. এইচ. ডি-র ভুয়ো সার্টিফিকেট, পঞ্চাশ রকমের জগঝম্পমার্কা ভূত ধরার গ্যাজেট, এইসব দেখে তো রামলালবাবুর তো চক্ষু ছানাবড়া।

মোটা টাকার অগ্রিম চেক ধরিয়ে দিয়ে, আরো মোটা অঙ্কের চেকের প্রমিস করে, একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট ফিক্স করে গেলেন রামলালুবাবু।

রামলালবাবু অফিসঘরের দরজাটা দিয়ে বাইরে বেরনোমাত্র শ্যামল আর ভূতনাথবাবুর মধ্যে একটা দৃষ্টি বিনিময় হয়ে গেল।

এবার নাটকের শেষ অঙ্ক বাকি রইল শুধু।

তা এটা তো গেল মাস খানেক আগের গল্প।

আজ এই নাটকের ক্লাইম্যাক্স এ্যান্ড ফাইনাল পে-ডে।

রামলাল শর্মার প্রাসাদে ঢুকেই নিজের কাজ শুরু করেন মিঃ সমাদ্দার। শ্যামলের হাত থেকে কালো ব্যাগটা নিয়ে সেটা থেকে সরু মেটাল ডিটেক্টর জাতীয় একটা যন্ত্র বার করে সেটি অন করেন। তারপর বিভিন্ন ঘরের সামনে সেটা নিয়ে নিয়ে ঘুরতে শুরু করেন। বাড়ীর লোকজন হাঁ করে এই মডার্ণ তান্ত্রিকের কান্ডকারখানা দেখতে থাকে। দোতলায় ডান দিকের কোণের সবচেয়ে বড় ঘরটার বন্ধ দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই যন্ত্রটা থেকে ভীষণ জোরে বিপ্ বিপ্ করে শব্দ আর সেইসাথে লাল আলো বেরোতে থাকে।

বাড়ীর কর্তার দিকে ফিরে তিনি জিগ্গেস করলেন – “এটা কার ঘর?”

রামলালবাবু সভয়ে উত্তর করলেন – “ইইইটা হামার মেয়ের ঘোর ছিল।”

মিঃ সমাদ্দার সবাইকে বাইরে রেখে একা ঘরটায় ঢুকলেন। বিভিন্ন রকমের আওয়াজ গলার শব্দ আসতে থাকে ভেতর থেকে। ঘরের প্রতিটা লোক উৎকর্ণ হয়ে উৎকন্ঠা নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে। প্রায় দশ মিনিট পর তিনি বেরোলেন।

বেরিয়ে বললেন- ” রামলালজী আপনার মেয়ের আত্মা খুব কষ্টে আছে। ওই এসব করছে আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য।

ওর সব গয়না আত্মসাৎ করে আপনার জামাই ওকে সিঁড়ি থেকে ঠেলে ফেলে দিয়ে হত্যা করেছে। আপনি পুলিশ-এ জানিয়ে কেস রি-ওপেন করুন। তবেই ওর আত্মা শান্তি পাবে।”

গাড়ীতে ফেরার সময় দশ লাখ টাকার চেকটা হাতে নিয়ে একটু মনটা খচখচ করছিল ভূতনাথবাবুর।

“মিছিমিছি নির্দোষ জামাইটার ঘাড়ে দোষ চাপানো হয়ে গেলনা তো! অবশ্য সত্যিই নিরপরাধ হলে আবার প্রমাণের অভাবে আগের মত ছাড়া পেয়ে যাবে। তান্ত্রিকের বুজরুকি তো পুলিশ সাক্ষী হিসেবে মানবেনা”।

এই বলে মনকে প্রবোধ দিলেন ভূতনাথবাবু। এ তো আর প্রথমবার এরকম করলেননা তিনি।

কয়েকহপ্তা পর হঠাৎ একদিন সন্ধ্যেবেলায় শ্যামলের ফোন এল। ছেলেটা ভয়ার্ত কন্ঠে বলল –

“দাদা! রামলাল ওর মেয়ে খুন হয়েছে, এটা আপনার মুখ থেকে শোনা ইস্তক ক্ষেপে ছিল। মাথা গরম করে, পুলিশে না গিয়ে ওর মেয়ের বরটাকে গুন্ডা দিয়ে জানে মেরে দিয়েছে একদম।

ওই বাড়ির সেই পরিচারিকা গীতা জানাল এইমাত্র। এবার কী হবে! যদি আমাদের নিয়েও টানাটানি হয়?”

ভূতনাথবাবু কোনোমতে শ্যামলকে শান্ত করে ভাবতে লাগলেন এবার কী হতে পারে। পুলিশ যদি তদন্ত করতে নেমে ভূতনাথবাবুর এই ফ্রড বিজনেসটারও সন্ধান পায়।

ভাবতে ভাবতে কখন যেন চোখ লেগে গেছিল। রাতদুপুরে হঠাৎ ঘুমটা ভেঙে গেল ভূতনাথবাবুর। চোখ মেলে দেখেন ঘরের ছাদে একটা, না না দুটো অবয়ব। একটি নারী, একটি পুরুষ।

রক্তাক্ত নারীমূর্তিটা ওঁর দিকে কংকাল আঙ্গুল তুলে বলে উঠলো –

“কেন এরকম করলেন আপনি? আমার স্বামী নির্দোষ ছিল। আমার মৃত্যু নিছকই দূর্ঘটনা।”

মাথার ঠিক মাঝখানে একটা বড় গুলির গর্ত পুরুষমূর্তিটার। সেখান থেকে রক্ত গড়িয়ে নামছে মুখ বেয়ে, চিবুক বেয়ে। হিসহিসিয়ে বলে উঠলো

– “মিথ্যে যন্ত্রের লুকোনো সুইচ টিপে, আলো জ্বেলে শব্দ করে খুব ভূত ধরিস না তুই। আয় আমাদের দলে সামিল করে নিই তোকে আজ।”

মূর্তিদুটো ধীরে ধীরে সিলিং থেকে ক্রমশ নেমে আসতে থাকে ভূতনাথবাবুর বুকের ওপর।

এ. সি. ঘরেও কুলকুল করে ঘামতে ঘামতে উঠে বসেন তিনি। হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন স্বপ্ন দেখছিলেন বলে।

কয়েকদিন কেটে গেছে এরপর। নতুন ভিকটিমের ছানবিন করতে করতে রামলালের ঘটনাটা, স্বপ্নটা দুটোই ভুলতে বসেছিলেন। সকালবেলায় কালো ব্যাগ থেকে যন্ত্রটা বার করে নেক্সট অপারেশনের আগে চেক করবেন বলে প্লাগে লাগালেন ভূতনাথবাবু। লুকোনো সুইচটা টেপার আগেই যন্ত্রটায় বিপ্ বিপ্ শব্দ আর আলো চমকাতে শুরু করলো। বারবার অন্য প্লাগে লাগিয়ে টেস্ট করতে গেলেন, প্রতিবার এক কান্ড।

সব কাজ ফেলে শিগ্গির ছুটলেন নিমাই খুড়োর ইলেকট্রিক যন্ত্রপাতি সারাইয়ের দোকানে, যেখান থেকে ওই লুকোনো সুইচের কারচুপিটা করিয়েছিলেন।

দোকানের টুলে বসে বসে বোর হয়ে গেলেন ভূতনাথবাবু। যতবার খুটখাট করে নিমাইখুড়ো প্লাগে লাগায় সেই এক কান্ড। ভূতনাথবাবু বললেন – “খুড়ো তুমি সারাও। আমি একটু চা বিড়ি খেয়ে আসি।”

এই বলে যেই না একটু দূরে সরেছেন দোকানের প্লাগে লাগানো যন্ত্রটা চুপ করে গেল। আগ্রহে যেই এগিয়ে এলেন আবার বিপ্ বিপ্। মনটা শিউরে উঠল। ভয়ে পিছোলেন, আওয়াজ বন্ধ। ভূতনাথবাবু আর ভাবতে পারছেননা।

” সেদিনের স্বপ্নটা কি সত্যি ছিল? আমি কি তবে মারা গেছি? নকল যন্ত্রটা কি আসল কথা জানান দিচ্ছে! ”

কখন পিছোতে পিছোতে ফুটপাথ ছেড়ে রাস্তায় নেমে গেছেন খেয়াল করেননি। একটা দৈত্যের মত ছুটে আসা ট্রাকের চাকায় পিষে গেল ভূতনাথবাবুর দেহটা।

ঠিক তখনই দোকান থেকে নিমাইখুড়ো বলে উঠল -“এই তো ঠিক হয়েছে। লুজ কানেকশান হচ্ছিল, বুঝলে হে ভূতনাথ।

“ভূতনাথবাবু মরিয়া প্রমাণ করিলেন….”

— সমাপ্ত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here