Home Bangla ভয়াবহ ট্রেণ দুর্ঘটনা

ভয়াবহ ট্রেণ দুর্ঘটনা

30
0

ট্যাক্সীতে আসতে-আসতেই ‚ নীলাকে বললাম ‚ দেখ ‚ আজ কোথায় আমি রাউরকেল্লায় অলরেডি পৌঁছে গেছি ‚ তা নয় মাঝখান থেকে বাবা বাথরুমে পড়ে গিয়ে…………

নীলার বাবা ‚ সোম-আঙ্কেল বললো ‚ দেখো বাবা একসিডেন্ট ইজ একসিডেন্ট | কখন কি-ভাবে হবে ‚ আগে থেকে বোঝাই যায়না |

তবুতো ভালো ‚ কাল না-যেতে পারলেও ‚ আজকের তৎকাল টিকিটটা-তো পেয়ে গেছ |

হ্যাঁ আঙ্কেল ‚ আর বাবার এই একসিডেন্টটা দু-দিন পরে হলেতো খুবই অসুবিধা হত | তুমি হয়তো বলবে ‚ আমরাতো আছি…..

তবু ‚ বাবা আমাকে যে-ভাবে ডিপেন্ড করে ‚তোমার কাছে ফ্রী হয়ে সব শেয়ার করতেও পারতোনা |

হ্যাঁ ‚ স্বজল ‚ সেটা…..

বাবু আ গয়া হাওড়া ইষ্টিশান ‚ বলে ট্যক্সীটা দাঁড় করিয়ে দিল ড্রাইভার |

আমার ট্রেণ রাত ২৩|৫৫ মানে প্রায় বারোটায় | এতো রাত পর্যন্ত তোমাদের ওয়েট করার কোন মানেই হয়না ‚ নীলা আর ওর মা-বাবাকে বললাম |

নীলা বলল ‚ আচ্ছা এখনতো এগারোটা দশ | বাপি তোমরা গাড়ীতেই থাক ‚ আমি ওকে একটু ছেড়ে দিয়েই আসছি | ঐ প্ল্যাটফর্ম অব্দিই যাব |

দুজনে গল্প করতে-করতে এগোলাম | প্ল্যাটফর্মে গিয়েই দেখি , গাড়ী দাঁড়িয়ে আছে | প্যাসেঞ্জারও সবাই উঠে পড়েছে প্রায় | দু-চারজন ইতিউতি করছে |

আমার নামের লিষ্ট দেখে ‚ দুজনেই কম্পার্টমেন্টে উঠে সিট খুঁজে বললাম ‚ দেখো নীলা ‚ সিটটা কিন্তু আমি ভালই পেয়েছি |

জানালার ধারে এই লোয়ার বার্থটা আমার খুবই পছন্দের |

নীলা আমার বিছানাটা ঠিক করে নিতে সাহায্য করল |

তারপর আমিই তাড়া লাগালাম ‚ নীলা এবার তুমি এগোতে থাক | আঙ্কেলরা ওয়েট করছেন ‚ এগারোটা আঠারো হয়ে গেছে ‚ একটু পরেই গাড়ীও ছেড়ে দেবে |

প্লিজ যাওয়ার পথে ‚ মাকে একটু বলে যেও ‚ আমি ঠিকঠাক গাড়ীতে উঠে গেছি |

ইটস টু-মাচ স্বজল | এ-কথাটা তুমি না বললেকি আমি বলতাম না ?

নিজেই জিভ কেটে বললাম স্যরি ‚ খুব ভুল হয়ে গেছে |

নীলা নেমে যাওয়ার মিনিট খানেক পরেই দেখি ট্রেণটা নড়ে উঠে ‚ চলতে শুরু করল |

কি ব্যাপার ? বিফোর টাইম ছাড়ল নাকি ?

জিজ্ঞেস করে ‚ এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখি ‚ ও বাবা ‚ সবাইতো চাদর-মুড়ি দিয়ে ঘুমে অচেতন | বড় আলো নিভে গিয়ে নাইট-ল্যাম্প জ্বলছে |

অগত্যা আমিও আস্তেআস্তে শুয়েই পড়লাম |

কিছুক্ষণ পরে ‚ বিকট শব্দে ঘুম ভেঙে যেতে দেখি ‚ পাশের লাইনেই একটা ট্রেণের চারটে বগি , এক্কেবারে উল্টে পড়ে আছে |

চারিদিকে অন্ধকার ‚ তারমধ্যেই উদ্ধারকার্য্য চলছে ‚ যুদ্ধকালীন তৎপরতায় |

আমাদের ট্রেণ কিন্তু থামলইনা |

অবাক হয়ে দেখলাম এতো বিকট আওয়াজের পরও আমার সহযাত্রীরাও দিব্যি ঘুমিয়েই আছে….

কিজানি আমার কেমন যেন গা ছমছম করে উঠল |

কোন ষ্টেশনেইতো গাড়ী দাঁড়াচ্ছেনা | হু হু করে ছুটে চলেছে |

যদিও সুপার-ফাষ্ট ট্রেণ ‚ তবু নির্দিষ্ট ষ্টেশনগুলোতে থামবেতো ?

কাকেই বা জিজ্ঞেস করব ‚ সবাইইতো মরার মতই ঘুমোচ্ছে |

বাকি সময়টা আর শুতেই পারলাম না | বসেই কেটে গেল রাতটা |

রাতও প্রায় শেষ হয়ে এসেছে ‚ একটু পরেই সকাল ছটা পনেরোতে-তো পৌঁছে যাব |

এখন কটা বাজে ‚ কে জানে ? এই অন্ধকারে ঘড়িও দেখা যাচ্ছেনা | সেই স্পটের পরথেকেতো নাইট-ল্যাম্পটাও নিভে গেছে |

একি ‚ এবারতো গাড়ীটাও দাঁড়িয়ে পড়ল ‚ দেখছি ‚ কোন ষ্টেশন ?

বেশ বড় জংশন বলেইতো মনে হচ্ছে |

উঁকি মেরে দেখি ‚ প্ল্যাটফর্মে কয়েকজন শুয়ে আছে…..

একজনকে জিজ্ঞেস করতেই বললো ‚ মানে ?

আপনি কে ‚ এখন এলেনই বা কোথা থেকে ? এটাতো রাউরকেল্লা …..

আর কথা না বাড়িয়ে তাড়াতাড়ি আমার মাল নামাবো বলে এগিয়ে দেখি….আমার ব্যাগ বেডিং সব প্ল্যাটফর্মেই পড়ে আছে | ট্রেণের চিহ্ণও নেই ‚ কোন শব্দওতো পাইনি ‚ ট্রেণ ছেড়ে যাওয়ার….

খুবই ভয় পেয়ে ‚ লোকজনের কাছে গিয়ে পায়ে মুখ গুঁজে বসে রইলাম |

একজনের ডাকে ‚ তাকিয়ে দেখি ‚ সকাল হয়ে গেছে কখন | তার মানে ঘুমিয়েই পড়েছিলাম আমি |

তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন ‚ মশায়ও কি আহমেদাবাদের যাত্রী ?

আপনিতো আমারও আগে এসে পড়েছেন দেখছি | কিন্তু এদিকেতো শুনছি ‚ সে ট্রেণটাইতো বাতিল |

বাতিল মানে…দাঁড়ান ‚ ঐতো পেপার এসে গেছে , এবার পেপারেই ডিটেইলস জানা যাবে………

এইযে ভাই একটা ষ্টেসম্যান দেখি……….

আমি পেপারটা হাতে নিতেই…….

প্রথম পাতাতেই দেখি ‚ বড়বড় করে লেখা…………হাওড়া-আহমেদাবাদ সুপার-ফাষ্ট ট্রেণ ভয়াবয় দুর্ঘটনার কবলে |

এখনো পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা সরকারী হিসাবে শত-খানেক ‚ বেসরকারী মতে ‚ ওটা দেড়শোর কাছাকাছি |

চারটি বগি লাইনচ্যুত | যেসব বগির নাম্বার দেওয়া আছে ‚ তাতেতো আমার বগিটাও পড়ে |

তাহলে ওদিকে কলকাতায় কি অবস্থা ওদের ? মনে হতেই , নীলাকে কল করতে চেষ্টা করলাম………….

পকেট থেকে ফোনটা বের করে ‚ নীলাকে কল করার আগেই ‚ ওর কল এসে গেল….তুমি কোথায় ? হাউহাউ করে কাঁদছে তখনো |

আরে কাঁদছ কেন ? আমি বহাল তবিয়তে রাউরকেল্লা ষ্টেশনের প্ল্যাটফর্মে বসে আছি |

মানে ?? সে ট্রেণতো একসিডেন্ট করে….

হ্যঁ ‚ পেপারে আমিও কিছুটা পড়লাম ।

কাল রাতে বাড়ী ফিরে , বাপি টিভিটা চালিয়ে নিউজ দেখতে বসেছিল ।

অবাক হয়ে দেখে , প্রতিটা চ্যানেলেই বারবার , এই ট্রেণ-এক্সিডেণ্টের খবর আর ছবি দেখাচ্ছে । কিন্তু সম্ভাব্য মৃত বা আহতদের লিষ্টে তোমার নাম নেই , অথচ টিকিটের কপিতে , তোমার বগিও উল্টে যাওয়ার কথা ।

বাপি দিশা না-পেয়ে , আমাকে ডেকে সব বলে । সেই থেকে তোমার মোবাইলে অসংখ্যবার ট্রাই করেছি …………

কোন টাওয়ারই পাচ্ছিলাম না । তাই সবাই মিলে আন্টির কাছে , চলে এসেছি ।

আর তোমার ঘড়িটা ? ওটা ছুঁড়ে ফেলে দাও ।

নীলা , কি বলছো , খেয়াল আছে ? এইতো ছমাস আগে , আমার বার্থডেতে , তুমিইতো গিফ্ট করলে ওটা ?

তো ? ঐ ঘড়িটাইতো তোমাকে সময় দেখিয়েছিল , এগারোটা-দশ ।

আমি বাড়ী ফিরেই দেখি , সাড়ে-বারোটা । তখন অলরেডি এক্সিডেন্টটা ঘটে গেছে …………

আরে , তাতে ঘড়ির কি দোষ ? যন্ত্রতো বিগড়োতেই পারে । আসলে আমি কি-ভাবে এলাম , এটাইতো লাখ টাকার প্রশ্ন ।

প্লিজ স্বজল , ও প্রসঙ্গ আর তুলোনা । আমি জাষ্ট নিতে পারছিনা………….সেই ট্রেণ , নিজে তোমাকে বসিয়ে এলাম । অথচ………

ওঃ সত্যি , ভাবতে গেলে শিউরে উঠছি………………….

আমি কিভাবে সেই ট্রেণের যাত্রী হয়ে ‚ নিরাপদে এখানে পৌঁছে গেলাম ‚ ভাবতে গেলেও মাথা তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে | আমার মা-বাবা ?

এইতো তোমাদের বাড়ী থেকেই কল করছি | আন্টি ঠিকই আছে | আঙ্কেলকে জানানো হয়নি এখনো ।

ভালো হয়েছে ‚ এখন আমার পৌঁছানো সংবাদটাই দাও ।

কাগজেতো দেখছি , হাওড়া থেকে ছেড়ে , খড়্গপুর ঢোকার আগেই , দুর্ঘটনা ঘটেছে । এবার ধুমধাম করে , আমার একটা শ্রাদ্ধ-বাসরের আয়োজন……..

চোপ , খুব মজা লাগছে না ? এখানে আমরা হেদিয়ে মরছি ,আর তোমার এখনো ঠাট্টা ?

ওকে বাবা , স্যরি ম্যাম , আমার আর দেরি করলে হবেনা |

আটটা বাজে ‚ এখন গাড়ী ধরে ষ্টিল-প্ল্যাণ্টে গিয়ে আমাকে বেলা দশটাতে এনিহাউ রিপোর্ট করতে হবে |

তারপর জয়েন করে ‚ নিশ্চিন্ত হয়ে ভাববো ‚ ব্যাপারটা কোথা হইতে কি হইয়া গেল………

পাশের ভদ্রলোক বললেন , ও তারমানে , আপনিই ভদ্রদার জায়গায় এসেছেন ?

তাতো বলতে পারবনা , তবে এপয়েন্টমেণ্ট লেটারে , আমাকে আজই জয়েন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ।

ঠিক আছে চলুন , আমিও ওখানেই ফিরব । ওখানেই কোয়ার্টারে থাকি আমি । বছর আটেক হয়ে গেল ঐ ষ্টীল-প্ল্যান্টে ।

উনি নিজেই একটা গাড়ী ডাকতে , দুজনেই উঠে বসলাম ।

কথায়-কথায় পরিচিতি হল । উনি হিমাদ্রি রায় । সপরিবারেই থাকেন ।

উনি কিন্তু আমার দিকে বিস্ময়পূর্ণ দৃষ্টিতে চেয়েই আছন । বলেই ফেললেন , আপনি কি-করে হাওড়া-আহমেদাবাদ ধরে , এখানে এলেন , একটু ক্লিয়ার করুননা প্লিজ ………..

হিমাদ্রিদা , সত্যি বলতে কি , আমি নিজেই এখনো ঘোরের মধ্যেই আছি………….

বাড়ী থেকে বেরোলাম , বাবার ঘরের ঘড়িতে তখন সাড়ে-দশটা । দেরি হয়ে গেছে । ওদিকে আমার বান্ধবী , নীলা ,ওর মা-বাবাকে নিয়ে মৌলালীতে ওয়েট করছিল । স্রেফ ওদের তুলে নিয়েই হাওড়া ।

তারপরের ঘটনাতো সবই বললাম ।

উনি একটু চিন্তা করেই বললেন , কিন্তু কাগজের রিপোর্ট অণুযায়ী , ঐ ট্রেণ , ইন-টাইম হাওড়া ছেড়ে ঘণ্টাখানক যাওয়ার পরই , বিস্ফোরণের বিকট শব্দ করে , চারটি বগিই বিচ্ছিন্ন হয়ে উল্টে যায় ।

আপনার বগির কেউই বেঁচে নেই । অথচ……………

আচ্ছা আপনার ঘড়িতে কটা বাজে দেখুনতো।

ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আমি অবাক , সাড়ে-এগারোটাতেই বন্ধ ঘড়ি………..

হিমাদ্রদা বললেন , ভাই কিছু ক্ষেত্রে , যুক্তি ,বুদ্ধির বাইরেও অনেক ঘটনা ঘটে যার ব্যাখ্যা থাকেনা ।

এক্ষেত্রে আজই আপনার জয়েনিং ডেট , অথচ নানাকারণে বাড়ী থেকে বেরতেই দেরি করেছিলেন । ট্রেণ ,ঠিকসময়ে ছেড়ে গিয়ে , দুর্ঘটনার কবলে পড়ে ।

মাঝখান থেকে , আপনি ট্রেণ ধরতে না-পেরে , বহাল তবিয়তেই আছেন ।

এই দেখুন কথায়-কথায় এসেও গেছি । চলুন , আমিই আপনাকে বড়সাহেবের কাছে নিয়ে যাচ্ছি । খুব ভাল লোক উনি , আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। আপনার চাকরি হয়েই যাবে , তবে আপনার এই দেবদূতের মত উপস্থিত হওয়া নিয়ে , বেশ গরম আলোচনা চলবে কদিন…………………

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here