Home Bangla সহবাস

সহবাস

135
0
shohbas
shohbas

সব ইচ্ছে কি পূরণ হয়? হয় না| নিজের জীবনেই তো হল না| চেয়েছিল একটা স্বাধীন জীবন‚ যেখানে সেই হবে তার সমস্ত ইচ্ছে-অনিচ্ছের মালিক| কিন্তু হল কই? পরিস্থিতি তাকে ঠেলে দিল অন্যদিকে| বইয়ের পাতাটা পাখার হাওয়ায় উল্টে যায়| তনিশা দেখে কিন্তু খেয়াল করে না| ঐ পাতাতেই দাগানো প্রশ্নগুলো মুখস্থ করতেই বসেছিল সে| মন দিয়ে পড়ছিলও| একটু বেশিই তাকে পড়তে হয়| চট করে পড়া তার মুখস্থ হয় না| নাইয়া ম্যাডাম তাকে বলেছে ‚ ‘বুঝে বুঝে পড়বে তনিশা‚ দেখবে চট করে মুখস্থ হয়ে যাবে’| সেই চেষ্টাটাই সে করে| বুঝে পড়লে দেখেছে চট করে ভুলে যায় না| সামনেই টেস্ট| টেস্টে পাশ করলে‚ তবেই বোর্ডের পরীক্ষাটা সে দিতে পারবে| তিল তিল করে মনের ভিতর পুষে রাখা ইচ্ছার দোরে এসে দাঁড়িয়েছে সে| পারবে তো টেস্টে সিলেক্টেড হতে?

‘নতুন আম্মি‚ কিছু খেতে দাও| খিদে লেগেছে|’

ভাবনায় ছেদ পড়ে| বইটা বন্ধ করে উঠে যায় তনিশা| মুড়ির কৌটো থেকে মুড়ি ঢেলে নিয়ে আসে একটা বড় বাটিতে| আট বছরের সুরিয়ার এতটা মুড়ি লাগবে না| কিন্তু তনিশা জানে‚ সুরিয়ার সাথে ওর বাবা বসিরও এসেছে| তাকেও তো খাবার দিতে লাগবে| বসির‚ তার নতুন স্বামী| এই দিনকয় হল বিয়েটা সে করে ফেলেছে| একরকম বলা যায় করতে বাধ্য হয়েছে| বাড়ির কেউ বিয়েতে আসেনি| আসার কথাও না| বিয়েটা ঠিক এখনি হবার কথা ছিল না| সে বলেছিল‚ বোর্ডের পরীক্ষা দিয়েই সে বিয়েটা করবে কিন্তু বসির আর তার বাড়ির লোকের তর সয়নি|

‘নাও সুরিয়া‚ মুড়ি আর নকুলদানা দিয়েছি ‚ খেয়ে নাও| আব্বা কোথায় তোমার?’

‘বাইরে’| বলে সুরিয়া বাটির মধ্যে হাত ডুবিয়ে মুঠো মুঠো মুড়ি মুখে তোলে|

বিয়ের একটা শর্ত দিয়েছিল তনিশা‚ যতদিন না পরীক্ষাটা শেষ হচ্ছে ততদিন ওরা সহবাস করবে না| কিন্তু বসির মুখে মানলেও বাস্তবে মানে নি| আজ আবার এসেছে| বাইরে এসে দেখে বসির দরজায় দাঁড়িয়ে|

‘বাইরে কেন‚ ভিতরে এসো| সুরিয়ার খিদে লেগেছিল‚ তাই ওকে আর তোমাকে একসাথে মুড়ি দিয়েছি| খেয়ে নাও|’

বসির ভিতরে এসে সুরিয়ার পাশে বসে| সুরিয়া মুড়ির বাটিটা এগিয়ে দেয়| দু-একটা মুড়ি তুলে নিয়ে দাঁতে কাটে বসির| মুড়ির খিদে তার পায় নি| অন্য খিদে নিয়ে সে এখানে এসেছে| ঘোর লাগা চোখে সে তাকায় তনিশার দিকে|

তনিশা চোখ ফিরিয়ে নেয়| ও চোখের দৃষ্টিতে নিশির ডাক আছে| এ ডাক উপেক্ষা করা কঠিন‚ বছর পাঁচেকের উপোসী শরীর জানান দেয়| আগেও দিয়েছে| মুন্নির বাপের সাথে‚ মানে তার প্রথম স্বামীর সাথে তালাকের পরও সে কতবার যে স্বপ্নে স্বামীর সোহাগে আপ্লুত হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই| মনের মধ্যে পাপবোধ চাড়া দিয়ে উঠেছে| বারবার সে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়েছে তার এই গুনাহার জন্য| কিন্তু বসির তো তার বর্তমান স্বামী| এখানে গুনাহার তো কিছু নেই| অস্থির হয়ে ওঠে| দ্রুত নিজেকে সামলে নেয় তনিশা| মাথার ওড়নাটা আরও বড় করে টেনে নেয় মুখের ওপর|

‘আজ কি মনে করে?’

‘কেন বউ-এর সাথে দেখা করতে আসতে নেই নাকি?’ বসির জানতে চায়|

তনিশার অবাধ্য চোখ বসিরের চোখ ছুঁয়ে আসে| সে চোখে তখনও অবাধ্য আহ্বান|

‘তা নয়| রাতে কি খেয়ে ফিরবে?’

‘তোমার তো সামনে পরীক্ষা| রাতের রান্না করলে তো সময় নষ্ট হবে| আমরা একটু পরেই ফিরে যাব|’ বসির জানায়|

‘তা হলে এলে কেন?’ হঠাৎ করেই অসাবধানে প্রশ্নটা মুখ থেকে বেড়িয়ে যায়| তনিশা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে| ‘না ‚ মানে এলে যখন খেয়ে যাবে না‚ সেটা ভালো দেখায় না|’

হাসে বসির|

‘ নতুন অম্মি আমি তোমার কাছে থাকব আজ?’ সুরিয়া হঠাৎ জানতে চায়|

মেয়েটা ভারি ভালো| এত সহজে কাউকে নিজের মায়ের জায়গায় রাখতে তনিশাও পারবে না| কিন্তু মেয়েটা কত সহজেই তাকে মায়ের জায়গায় বসিয়ে নিয়েছে| আলত করে মেয়েটাকে টেনে নেয় নিজের কোলেতে| তারপর বলে‚ ‘ তুমি থাকতে চাইলে থাকতে পার| কিন্তু তোমার আব্বু থাকবে না|’

সুরিয়া বিগত বছরগুলিতে আব্বুকে ছেড়ে কখনও একা কোথাও থাকেনি| নতুন অম্মির কথায় সে উঠে দাঁড়ায়| ‘আব্বা না থাকলে আমি একা একা তোমার কাছে থাকতে পারব না| আব্বা থাকলে তোমার কি অসুবিধা? ‘

‘ সামনে আমার পরীক্ষা আছে সুরিয়া| তাই ..’

‘ আমি আর আব্বা তোমাকে জ্বালাবো না| আমরা তো খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ব|’

তনিশা বলার মত কিছু খুঁজে পায় না| এই ছোট্ট মেয়েটাকে কি করে বোঝায়?

‘বেশ থাকো তোমরা| আমি রান্না বসাই|’ তনিশা উঠে লাগোয়া বারান্দায় রাখা গ্যাসের ওভেনটা ধরিয়ে ভাত বসায়| নিজের জন্য তেমন কিছু রান্নাবান্না করে না| কিছু একটা করে নিলেই হয়ে যায়| কিন্তু বসির আর মেয়েটার জন্য কিছু তো ভালো রাঁধতেই হয়| পাশের দোকান থেকে ডিম কিনে আনে| ডিমের ঝোল আর ভাত মন্দ হবে না|

এক কামরার একটা ঘরে সে থাকে| লাগোয়া বারান্দায় এক চিলতে রান্নার জায়গা| রান্না করতে করতেই মুন্নির কথা মনে পড়ে| মুন্নিও শুনেছে তার নতুন আব্বার কথা| মুন্নিকে দেখেনি দুবছর হয়ে গেল| কতকাল রান্না করে খাওয়ায় না| মনটা বড় খারাপ লাগে|

‘নতুন অম্মি‚ রান্না হয়েছে? আমার খিদে লেগেছে?’

‘ হ্যাঁ সুরিয়া| তুমি তোমার আব্বুকে ডেকে নিয়ে এসো| আমি বসার জায়গা করছি| ‘

খাওয়া-দাওয়া মিটতে মিটতেই রাত গভীর হয়| সুরিয়া খেতে খেতেই ঢুলতে থাকে| তাকে মুখ ধুইয়ে মেঝেতে বিছানা পেতে শুইয়ে দেয় তনিশা|সুরিয়ার পাশেই বসিরের বিছানা করে দেয়| সব কাজ সেরে সে আবার বই-পত্তর খুলে বসে| অনেকটা পড়া এখনও বাকি| কাল নাইয়া ম্যাম এই প্রশ্নগুলো থেকে লিখতে দেবে বলেছে| এরা না এলে এতক্ষণে অনেকটাই পড়া হয়ে যেত| হাতে সময়ও তো বেশি নেই| এই সাত-পাঁচ ভেবেই সে বিয়েটা এখনই করতে চায়নি| রহমতের সাথে ছাড়াছাড়ির পর থেকেই অম্মি বিয়ে দেবার চেষ্টা চালিয়েই যাচ্ছে| অম্মির একটাই কথা‚ এই বয়সে পড়ে কি হাতি-ঘোড়া লাভ হবে? বরং বিয়ে করে একটা সংসার করাই ভালো| কিন্তু তনিশার চোখে স্বপ্ন ভাসে সে অনেক পড়বে‚ অনেক বড় হবে| জানে বয়সটা বসে নেই| এখনই সে চব্বিশ| তবু সাধ যে হয় বড় হবে‚ বড় চাকরী করবে| কারও হাততোলা হয়ে সে থাকবে না| ছোটখাটো কিছু কাজ করে সে নিজের খরচ তো চালিয়েই নেয়| এইসব প্ল্যান-প্রোগ্রামের মধ্যেই ভাই সম্বন্ধটা নিয়ে আসে| এর আগেও এনেছে| লেগেও লাগেনি একটাও সম্বন্ধ| কিন্তু বয়সটা বাড়ছে‚ এরপর ভালো পাত্র পাওয়া মুশকিল হবে| বসিরের পছন্দ হতেই তাই তনিশার অব্বু-অম্মি ধরে বসেছিল একেই বিয়ে করতে হবে| ঠিক হয়েছিল‚ বোর্ডের পরীক্ষাটা হয়ে গেলেই বিয়েটা হবে| কিন্তু ও বাড়ি থেকে এত তাড়া দিল যে শুধু ভাই দাঁড়িয়েই বিয়েটা দিয়ে দিল| অবশ্য এ কদিনে মনে হয়েছে বসির লোক খারাপ না| অন্তত‚ মুন্নির বাপ রহমতের থেকে ভালো| রহমতের সাথে যখন বিয়ে হয়েছিল‚ তখন বিয়ে কি জানতই না| রহমতের শরীরের নিচে মরার মত পড়ে থাকত| মন নয় শুধু শরীর| শরীরের দ্বার দিয়ে মনের দ্বারে কখনও রহমত ঢুকতেই পারেনি| তাই রহমত ছেড়ে চলে যাবার পরও একটুও দুঃখ পায়নি সে|

অনেকটা মুখস্থ হয়ে গেছে| ঘাড়-মাথা ভার হয়ে আসছে| একটু কি শুয়ে নেবে? হেলান দেয় নিচের পাতা বিছানায়| বসির আর সুরিয়ার থাকে বেশ কিছুটা দুরত্ব রেখে নিজের শোবার জায়গা| ঝিমধরা শরীরে হঠাৎ একটা স্পর্শে চমকে ওঠে| বসির| কিছু বলতে চায় সে‚ কিন্তু বসির তনিশার ঠোঁটে আঙুল রেখে চুপ করতে বলে‚ সুরিয়া উঠে পড়তে পারে|

তনিশা বসিরকে ঠেলে বাইরে চলে আসে| রাত তখন গভীর| মফঃস্থলের রাতে স্পষ্ট ঝিঁঝির ডাক| দূরে একটা কুকুর ডেকে ওঠার সাথে সথেই অন্য কুকুরগুলো সাথ দিল| শ্বাস ফুলে গেছে| বসিরের আঙুলগুলো যেন জ্বরে উত্তপ্ত| স্পর্শে আগুন ছড়িয়ে দিচ্ছে|

‘আমি কিন্তু তোমায় কোনভাবেই বিরক্ত করছি না তনিশা| তুমি এতক্ষণ পড়লে তাতেও আমি ধৈর্য ধরে অপেক্ষাই করেছি|’

বসিরও তনিশার পেছু পেছু এসে বাইরের চিলতে চলনপথে দাঁড়ায়|

‘কিন্তু বসির‚ কথা তো তাই ছিল না| আমি সেই শর্তেই তোমায় বিয়ে করেছি|’

বসির কথা বলে না| সময় যেন হঠাৎ করেই থমকে যায়| গুমোট করে তোলে সমগ্র পরিবেশকে| নিস্তব্ধতা ভাঙে তনিশা|

‘রাগ করো না বসির| মাঝের তো কয়েকটা দিন| দেখবে ঠিক কেটে যাবে|’

‘একটা রাতে কি খুব বেশি ফারাক হয়ে যাবে তনিশা? খুব ক্ষতি হয়ে যাবে তোমার পড়াশোনার?’

হাসে তনিশা|

‘মানুষের রক্তের স্বাদ পাওয়া বাঘ শুনেছি আর অন্য জন্তু জানোয়ার মুখে তোলে না| সে বার বার হানা দেয় লোকালয়ে| একটা রাত যে অনেক কিছু বসির| একটা বিশ্বাসের মৃত্যু‚ যে মানুষটার সাথে আগামী দিনে আমি ঘর করব সে মানুষটাকে যদি না শ্রদ্ধা করতে পারি‚ যদি না বিশ্বাস রাখতে পারি‚ তাহলে ঘর কি করে করব? রহমতের সাথে তাহলে তোমার ফারাকটা কোথায়? যখনই তার ক্ষিদে পেত‚ মুখের কাছে নধর ছাগলছানার মত আমাকে ঠুকরাত| আমি তোমার মধ্যে রহমতকে দেখতে চাই না| বিশ্বাস কর আমারও খুব ইচ্ছে করছে তোমার কাছে ধরা দিতে| কিন্তু না‚ তাহলে নষ্ট হয়ে যাবে আমার স্বপ্ন| আর আমি জানি তুমি আমার স্বপ্নকে নষ্ট হতে দেবে না|’

এবার বসির হাসে| নিস্তব্ধ রাতের স্বব্ধতাকে খান খান করে দেয় সেই হাসি|

‘আরে হাসছ কেন বসির? আমি কি হাসির কথা কিছু বললাম? আর এত জোরে হেসো না| লোক উঠে পড়বে|’ অস্বস্তি হয় তনিশার|

‘কথার জাল কি করে বুনতে হয় তুমি ভালো জান| ওদিকে তাকাও‚ পুর্বাকাশে জবাফুলের লালিমা| রাত আর বাকি কোথায়? ভোর তো হতেই চলল| চল একটু বিশ্রাম নিয়ে নেবে| আবার তো একটু পরেই পড়তে বসবে|’

হঠাৎ করেই ভীষন ভালো লেগে যায় বসিরকে| তীব্র ভরসায় লেপ্টে যেতে ইচ্ছে করে বসিএর শরীরের সাথে| তনিশা বলে‚

‘নাহ একটু দাঁড়াই এখানে আমরা দুজন|’

একটু একটু করে কালোরাতের কালিমা মুছে যেতে থাকে| সকালটা এত স্নিগ্ধ আগে মনে হয়নি| একটু একটু করে বসিরের গা ঘেঁষে দাঁড়ায় তনিশা| স্পর্শে এক অদ্ভুত স্নিগ্ধতা‚ আশ্বাস আর ভালো লাগা ছুঁয়ে যায় তনিশাকে| নতুন সূর্য ওঠা ওরা দেখবে একসাথে|

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here