কোন পুষ্টির অভাবে চুল সাদা হয়ে যায়? আর কোন খাবার খেলে চুল সাদা হয়ে যাওয়া বন্ধ হয়?

hair white

বয়সের সাথে সাথে মাথার চুল সাদা হয়ে যাবার ব্যাপারটা খুবই স্বাভাবিক হলেও মাঝেমধ্যে দেখা যায় অনেক অল্প বয়সেই মাথায় আচমকাই সাদা চুলের আবির্ভাব হয়! মাত্র বিশ বছর বয়সে মাথায় পাঁকা চুল দেখতে অবাক হওয়াটা খুব স্বাভাবিক। যুক্তরাজ্যভিত্তিক হাফিংটনপোস্ট এ নিয়ে কথা বলেছে বিশেষজ্ঞদের সাথে।

১) শরীরের রং উৎপাদনকারী কোষগুলি পিগমেন্ট তৈরি করা বন্ধ করে দিলেঃ

চুলের গোড়ায় পাওয়া যায় মেলানিন নামের একটি পিগমেন্ট বা রং সৃষ্টিকারি হরমোন। আপনার শরীর এই হরমোনটি তৈরি করা বন্ধ করে দিলে চুল ধীরে ধীরে ধূসর বর্ণ ধারণ করতে থাকে। নিউ ইয়র্কের ত্বক বিশেষজ্ঞ ডক্টর এরিক এমনটাই জানিয়েছেন। মেলানিনের পাশাপাশি চুল পাকার আরেকটি কারণ হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড। বয়স বাড়ার সাথে সাথে শরীরে ক্যাটালাইজ হরমোনের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। এই হরমোনটির কাজ হাইড্রোজেন পারঅক্সাইডকে ভেঙ্গে ফেলা। এই হরমোনের অনুপস্থিতিতে চুল হাইড্রোজেন পারঅক্সাইডের সংস্পর্শে আসে এবং পেঁকে যায়।

২) অল্প বয়সে চুল সাদা হবার অন্যতম প্রধান কারণটি জ্বিনগতঃ

জ্বিনগত কারণেই মূলত অল্প বয়সে চুল পাকার ব্যাপারটা চলে আসে। অর্থাৎ আপনার বাবা-মা অথবা দাদা-দাদীর মধ্যে অল্প বয়সে চুল সাদা হবার ব্যাপারটা থেকে থাকলে আপনার ক্ষেত্রেও তাই হবে। চেলসি স্কিন এন্ড লেজারের মেডিক্যাল ডিরেক্টর ডক্টর মিসেল এইডেলম্যান বলেন, “আমাদের জন্মের সময়ই আমাদের শরীরে কিছু কিছু তথ্যৱ প্রোগ্রাম করা থাকে। জ্বিন যে কেবলমাত্র চুল পাকার ব্যাপারটি নিয়ন্ত্রণ করে তাই না, এটি কতো দ্রুত হবে বা পাকা চুলের রং ধূসর হবে নাকি সাদা হবে তাও নির্ধারণ করে।” কিছু কিছু মানুষের ক্ষেত্রে দেখা যায় মাত্র ২০ বছর বয়সেই চুল সাদা হওয়া শুরু করে। আবার অনেকের ক্ষেত্রে তারা মাথায় প্রথম সাদা চুলটা পায় ৫০ বছর বয়সে গিয়ে। এটা হয় তাদের জ্বিনগত বৈশিষ্ট্যেল কারণে।

৩) চুল পাকা নির্ভর করে জাতিগত বৈশিষ্ট্য এবং লিঙ্গের উপরঃ

দ্যা ডার্মাটোলোজিস্টের একটি গবেষণা অনুযায়ী ককেসিয়ানদের চুল ধূসর হওয়া শুরু করে ৩০-৩৫ বছর বয়সে। এশিয়ানদের ক্ষেত্রে ৩৫-৪০ বছর বয়সে। অন্যদিকে আফ্রিকান-আমেরিকানদের ক্ষেত্রে সাধারণত ৪০ বছর বয়সে গিয়ে চুল ধূসর বর্ণ ধারণ করে। “গড়ে হিসাব করলে ৫০ শতাংশের চুল ৫০ বছর বয়সে গিয়ে পাকা শুরু করে,” বলেন ডক্টর এইডেলম্যান। নারী-পুরুষের ক্ষেত্রেও বয়সের পার্থক্য রয়েছে। পুরুষদের চুল পাকা শুরু হয় সাধারণত ৩০ বছর বয়সে গিয়ে। নারীদের চুল ধূসর হওয়া শুরু করে ৩৫ বছর বয়সে গিয়ে।

৪) চুল দ্রুত সাদা হয়ে যাওয়াটা কি কোনো শারীরিক সমস্যার লক্ষণঃ

মাথার চুল পেকে যাবার ব্যাপারটা একটি খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। খুব কম সময়েই এটির পেছনে কোনো শারীরিক সমস্যাকে দায়ী করা যায়। চিকিৎসাশাস্ত্রের দিক থেকে দেখলে শরীরে ভিটামিন বি-১২ এর ঘাটতি অথবা পিটুইটারি বা থাইরয়েড গ্রন্থিতে সমস্যা হলে চুলে পাক ধরার মতন ঘটনা ঘটলেও ঘটতে পারে। তবে এর সম্ভাবনা খুবই কম বলে জানান ডক্টর এইডেলম্যান।

৫) চুল দ্রুত পেকে যাবার পেছনে দায়ী সিগারেটঃ

বিভিন্ন সময় করা গবেষণায় ধুমপান ও মাথার চুল সাদা হবার ভেতরে সম্পর্ক দেখা গিয়েছে। ২০১০ সালে যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োটেকনোলজী ইনফরমেশনের প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে অধুমপায়ীদের চেয়ে ধুমপায়ীদের অল্প বয়সে চুল সাদা হবার সম্ভাবনা প্রায় দুই থেকে আড়াই গুণ বেশি!

কেবলমাত্র চুল সাদা হওয়াই হয়, মাথার চুল পড়ার পেছনেও দায়ী করা হয় এই সিগারেটকে। সিগারেটে থাকা ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থগুলি চুলের কোষকে ধ্বংস করে চুলের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে।

৬) বাড়তি দুশ্চিন্তাঃ

চুল পেকে যাবার পেছনে বাড়তি দুশ্চিন্তাকে দায়ী করার মতন তেমন কোনো প্রমাণ খুঁজে পাওয়া যায় নি। তবে ডক্টর এরিকের মতে দুশ্চিন্তা করার সময় শরীর থেকে নিঃসরিত হরমোনগুলি শরীরের মেলানোসাইট, অর্থাৎ মেলানিন তৈরির কোষগুলির উপর প্রভাব ফেলে। যা ধূসর চুলের কারণ হতে পারে।

“রাতারাতি কারো মাথার চুল পেকে যায় না। তবে দুশ্চিন্তা চুল পেকে যাবার প্রক্রিয়াটিকে ত্বরাণ্বিত করতে পারে,” বলেন এইডারম্যান।

৭) অল্প বয়সে চুল পেকে যাবার মানে কি সম্ভাব্য আয়ুষ্কাল কমে যাওয়াঃ

অনেকের মাঝেই এই ভুল ধারণাটা আছে যে তাড়াতাড়ি চুল পেকে যাবার মানে তার আয়ুষ্কাল অন্যান্যদের তুলনায় কম! ব্যাপারটি একেবারেই ঠিক নয়। এই যুক্তির পেছনে কোনোপ্রকার প্রমাণ পাওয়া যায় নি বলে জানিয়েছেন ডক্টর এরিক এবং এইডেলম্যান। ১৯৯৮ সালে ডেনমার্কের দ্যা জার্নালস অফ গেরোন্টোলজির ২০হাজার পুরুষ ও নারীর উপর করা গবেষণাতেও এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায় নি। সুতরাং, চুল দ্রুত পাকা মানে অন্যদের চেয়ে কম বাঁচবেন এমনটা ভাববেন না মোটেও!

৮) চুল সাদা হওয়া বন্ধ করার কোনো উপায় নেইঃ

“এখন পর্যন্ত কোনো টনিক, লোশন, ক্রিম বা ভিটামিন চুল সাদা করা বন্ধ করতে পারে বলে প্রমাণ পাওয়া যায় নি,” বলেন ডক্টর এইডেলম্যান। তবে খুব কম ক্ষেত্রেই শারীরিক কোনো অসুস্থতার কারণে চুল সাদা হওয়া শুরু করলে সেটা আবার সুস্থতার সাথে সাথে আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারে। ব্যাপারটি চুল পরার ক্ষেত্রেও কাজ করে। তিনি আরো বলেন যে, অনেকেই “অ্যালোপেসিয়া অ্যারিয়াটা” নামক রোগে আক্রান্ত হয়। এই রোগে আক্রান্ত রোগীদের মাথার নির্দিষ্ট অংশের বা পুরো মাথার চুল পরা শুরু হয়। এই রোগ থেকে আরোগ্যের পর শুরুতে শুরুতে যে চুলগুলি ফিরে আসে সেগুলি সাদা হয়। কারণ চুলের পিগমেন্ট কোষগুলি তখনও নতুন চুল ওঠার ব্যাপারটাকে ঠিকভাবে ধরতে পারে না।

৯) ধূসর চুল লুকানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় চুলে রং করাঃ

ডক্টর এরিকের মতে পাকা চুল লুকানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো চুলে রং করা! তবে ডক্টর এইডেলম্যান তেমনটা মনে করেন না। তার মতে চুল রং করে কখনোই পুরোপুরি প্রাকৃতিক রংটা পায় না পুরুষরা। চুল ছোটো হওয়ায় পুরুষদের চুলের গোড়া সহজেই দেখা যায়।

১০) পাকা চুলে বেশি ময়েশ্চারাইজার থাকা শ্যাম্পু ও কন্ডিশনার ব্যবহার করুনঃ

চুল পাকা হবার সাথে সাথে এর গঠন বদলে যায় এবং চুল অনেক বেশি শুষ্ক ও ভঙ্গুর হয়ে যায়। ডক্টর এইডেলম্যান পাকা চুলের আর্দ্রতা বজায় রাখতে ময়েশ্চারাইজার বেশি এমন শ্যাম্পু ও কন্ডিশনার ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন। চুল শুকানোর জন্যে ব্লো ড্রায়ার ব্যবহার না করাই ভালো। প্রতিদিন শ্যাম্পু ব্যবহার করতেও নিষেধ করেছেন তিনি।