করোনা মহামারী পরবর্তী আগামীদিনের খাদ্য সংকট মোকাবিলায় করণীয় ।

agriculture
agriculture

কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা (৩৫তম বিসিএস) Kbd Jahangir Liton

অব্যবহৃত জমিতে (রাস্তার দুই পাশ, পুকুর পাড়, জমির আইল, বাড়ির আঙিনা ইত্যাদি) কী ধরনের শাক-সবজি চাষ করতে পারেন?

সারাবিশ্বে এখন করোনা মহামারীতে বিপর্যস্ত, খাদ্য উৎপাদন ব্যাঘাত ঘটলে অচিরেই খাদ্যের সংকট দেখা দিবে সারাবিশ্বে। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে কোন দেশ থেকে খাদ্য সহযোগিতা পাওয়াটা সত্যিই দুষ্কর। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বারবার তাগিদ দিচ্ছেন গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে যেনো আমরা সবাই অলস না থেকে জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার করে কিছু না কিছু চাষ করি।

বাংলাদেশ একটি কৃষি প্রধান দেশ। সাম্প্রতিক সময়ে কৃষিতে অভাবনীয় সাফল্য অর্জিত হয়েছে। দেশে রীতিমতো সবজি বিপ্লব ঘটে গেছে গত এক যুগে। জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থার তথ্য মতে, সবজি উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে তৃতীয়; চীন ও ভারতের পরেই এর অবস্থান। গত ৪০ বছরে সবজির উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৫ গুণ।

পুষ্টি ও গুনগত মানের খাদ্যের জন্য শাক সবজির বিকল্প নাই। প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দৈনিক ২০০-২৫০ গ্রাম সবজি খাওয়া উচিত। আমরা বাঙালিরা দু বেলা ভাত আর নিজেদের উৎপাদিত শাক সবজি খেতে পারলে অন্তত করোনার মহামারীতে আমরা কেউ না খেয়ে থাকবো না। পাশাপাশি উৎপাদন বেশি হলে প্রতিবেশীকে সহযোগিতা করলে যেমন সওয়াব হবে ঠিক তেমনি সম্পর্ক ভালো থাকবে।

আমাদের মাটি অত্যন্ত উর্বর চাইলেই আমাদের বাড়ির আশেপাশে অব্যবহৃত আঙ্গিনা, পুকুর পাড়, রাস্তার দুই পাশ, জমির আইলে সহজে সবজি ফসলের আওতায় আনতে পারি। বাড়ির ছাদে কিংবা শতবছরের ঐতিহ্য গ্রামের ছন/ টিনের চালায় ও সবজি আবাদ করা যায় যা নিজদের পরিবারের জন্য যথেষ্ট।

কোথায় কি ধরনের সবজি চাষ করবেন এর জন্য দরকার একটি ছোট পরিকল্পনা যেমন-

# যেখানে সূর্যের পর্যাপ্ত আলো আছে বিশেষ করে বাড়ির আঙ্গিনায় চাষ করা যায়- বেগুন, টমেটো, মরিচ, লালশাক, পুইশাক, ঢেড়স, ডাটা, লেবু ইত্যাদি।

# ঘরের চালায় কিংবা বাড়ির চারপাশে বাউন্ডারি থাকলে সেখানে লতানো সবজি চাষ করা যায়। যেমন- কুমড়া জাতীয় সবজি (লাউ, মিষ্টি কুমড়া, চাল কুমড়া, চিচিঙ্গা, ধুন্দল, কাকরোল ইত্যাদি), শিম, বরবটি ইত্যাদি।

# বাড়ির আশেপাশের বহুবর্ষজীবী ফল গাছের গোড়ায় (যেমন- আম, জাম, কাঠাল, কাঠ জাতীয় গাছে) চাষ করতে পারেন ধুন্দল, শিম জাতীয় সবজি।

# পুকুর পাড়ে পর্যাপ্ত আলো বাতাসের ব্যবস্থা থাকলে সব ধরনের সবজি করতে পারবেন তবে এইসমস্ত জায়গায় পেপে, মিষ্টি কুমড়া, লাউ এবং সজিনা করতে পারেন।

# ধানের জমির আইলে সবজি চাষ করা যায়। সেক্ষেত্রে ধান রোপণ করার সাথে সাথেই সবজি রোপণ করতে পারেন সেক্ষেত্রে আইলটা একটু চওড়া রাখতে হবে। ধানের পাশাপাশি অতিরিক্ত ফসল উৎপাদন হবে যেটা আপনার জমিতে উপকারী পোকামাকড় সংরক্ষণ করবে যা আপনার জমিতে ক্ষতিকর পোকার আক্রমণ কম করতে সহয়তা করেবে। এতে আপনি আর্থিকভাবে যেমন লাভবান হবেন পাশাপাশি পাশাপাশি পুষ্টি চাহিদা নিশ্চিত হবে। আইলের উপযোগী সবজি হলো- শিম, বরবটি, ঝাড় শিম, লাল শাক, পুইশাক, টমেটো, ঢেড়স ইত্যাদি।

# বাড়ির আশেপাশের পরিত্যক্ত কিংবা ছায়াযুক্ত স্থানে আপনি চাইলে সহজে আদা, হলুদের আবাদের আওতায় নিয়ে এসে এলাকার মসলার চাহিদা মিটাতে পারেন।

# আগামী মাস খানেক পর বৃষ্টিতে অনেক নিচু অঞ্চল বৃষ্টি এবং বর্ষার পানিতে জলাবদ্ধ থাকবে প্রায় ৩/৪ মাস। আমাদের দেশে প্রতিটি অঞ্চলেই ভাসমান কচুরিপানা পানিতে ভেসে থাকে প্রায় বছরব্যাপী। এ জঞ্জাল কচুরিপানাকে ধাপে ধাপে আটকিয়ে পরিকল্পনা করে তারপর সেসব ধাপের উপর টেপাপানা দিয়ে তৈরি করতে পারেন ভাসমান বীজতলা।

সেসব ভাসমান বীজতলায় কুমড়া, শিম, বরবটি, টমেটো, বেগুন, করলা, চিচিঙ্গা, ঝিঙ্গা, লাউশাক, লালশাক, পালংশাক, ডাঁটাশাক চাষ করেন। এসব ভাসমান বীজতলাগুলো যাতে ভেসে না যায়, সেজন্য শক্ত বাঁশের খুঁটির সাথে বেঁধে রাখেন। শুকনো মৌসুমে পানি সরে গেলে সেসব কচুরিপানার ধাপ জমিতে মিশে জৈব পদার্থের অতিরিক্ত জোগান দেয়। জমি হয় আরো উর্বর।

আমাদের দেশে রয়েছে হাজারো স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন কিংবা ক্লাব, আপনারা এই মূহুর্তে নানা ধরনের ত্রান-সাহায্য কিংবা সচেতনতা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। এর পাশাপাশি যদি আপনার এলাকার প্রতি পরিবারকে ১০ গ্রাম করে সবজি বীজ উপহার দেন সেক্ষেত্রে আপনাদের গ্রামে ২০০ টি পরিবার থাকলে আপনাদের বীজ লাগবে.

১০ গ্রাম × ২০০ পরিবার = ২০০০ গ্রাম অর্থাৎ ২ কেজি।

বাজারে কৃষক পর্যায়ের ভালো বীজ পাওয়া যায় আমি সর্বশেষ যতুটুকু জানি গ্রীষ্মকালীন সবজির এই ধরনের বীজের দাম কেজি প্রতি ৬৫০/- টাকা হতে ১২০০/- টাকা।

আপনারা যদি ২০০০/- টাকার বীজ কিনে উপহার দেন এবং এগুলো যত্ন সহকারে রোপণ করতে উৎসাহ দেন আগামী ৮০/৯০ দিন পর যখন ফলন আসা শুরু হবে এর আর্থিক মূল্য দাঁড়াবে ২,০০,০০০/- টাকার অধিক। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো আপনাদের এলাকায় সবজি ঘাটতি থাকবে না।

আপনারা চাইলেই পরিত্যক্ত যেমন- রাস্তার দু’পাশে, এলাকার শহরে থাকে এমন ব্যক্তির বাড়ি যাদের জমি খালি পরে আছে অথবা খাল, বিল -জলাশয় এসব সবজি চাষের আওতায় এনে চাষ করে গরিব মানুষের মাঝে উপহার হিসেবে দিতে পারেন। অনেকেই বেকার বসে থাকেন সবজি চাষ বর্তমানে লাভজনক আরো অনেক আধুনিক ফসল এবং জাত রয়েছে যা আপনাকে স্বল্প সময়ে স্বচ্ছলতা এনে দিতে পারে।

কাজেই কৃষিতে আসুন, কৃষিকে ভালোবাসুন।

দেশকে পুষ্টি সমৃদ্ধ করতে উদ্যমী হোন, দেশের খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে ভূমিকা রাখুন।

কৃষিই সমৃদ্ধি