আপনার কি মনে হয় যে বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে সৌজন্য ও শিষ্টাচারের অভাব দেখা যাচ্ছে? কেন?

সৌজন্য ও শিষ্টাচারের

এই প্রশ্নের উত্তর আমার দেওয়া উচিত নয়। কারণ ঝগড়া করার জন্য অনেকেই মুখিয়ে আছেন।

বর্তমান প্রজন্মের লোক সবচেয়ে বেশি শিষ্টাচারী। যতই বেশি পেছনে যাবেন, ততই দেখবেন লোকে খুব অশিষ্ট ছিলেন। এর পরে আর তো পড়ার দরকার নেই।

১৯৫০ এর আগে মেয়েদেরকে পশু মনে করা হতো, সে হয়তো আপনার কাছে অজানা। ১৯২০ সালের আগে গ্রামের সাধারণ লোককে শহরের সাহেব-বাবুরা মানুষ মনে করতেন না। ১৮৫০ এর আগে স্বামী মরলে বউকে স্বামীর চিতায় পুড়িয়ে মারা হতো। ১৭৫০ এর আগে সাধারণ লোক আর দাসের মধ্যে তেমন কোন পার্থক্য ছিলোনা; আর দাস প্রথা খুব চালু ছিল।

মানুষ যে কি পরিমাণ মারামারি করত সে খবর আপনি একদম নেন কি? ভাষা মানেই ছিলো গালাগালি। ঈশ্বর বিদ্যাসাগর বা রবি ঠাকুরের নামে কি অভদ্র অশালীন কথা বলা হতো শুনলে কানে আঙ্গুল দেবেন।

শিষ্টাচার কথার মানে? শিক্ষিত লোকের কিছু কৃত্রিমতার নাম শিষ্টাচার। শিক্ষার হার বেড়েছে, লোকের টাকা পয়সা বেড়েছে, ভদ্রতার বাজার দর বেড়েছে। এই কিছুদিন আগেও গ্রামে থ্যাঙ্ক ইউ ধরণের কোন কথা চালু ছিলো না। ভিখারি ভিক্ষা পেয়ে কোন দিন ধন্যবাদ বলেনি, কারণ কেউ ধন্যবাদ শব্দটা জানতো না। আমি নিজেও ছোট বেলায় ধন্যবাদ বলিও নি শুনিও নি।

স্কুলে মাস্টারগণ বেত দিয়ে ছাত্র মারতেন। মাদ্রাসার হুজুরগণ লাঠি দিয়ে পিটাতেন। গ্রামের মুরুব্বিরা বিচার কাজে এসে বয়স্ক দোষী লোককে নিজের হাতে চড়-থাপ্পড় লাথি মারতেন, গালি দিতেন। গ্রামের দরবারে গালাগালিই ছিল আসল কাজ। কবিদের লড়াই ছিল বিশাল অশালীন গালাগালির আখড়া। যাত্রাপালা এতো অরুচিকর ছিলো যে গ্রামের ভেতরে যাত্রা করা নিষেধ ছিলোঃ মাঠের কোথাও প্যান্ডেল বানিয়ে সেখানে সকল অশ্লীলতার মেলা জমত। দূর্গাপূজার সময় বাপ আর ছেলে, মামা আর ভাগনে একসাথে পতিতা পল্লীতে পানজর্দা খেতে যেতেন। সে কি বিশাল শিষ্টাচার, মরি মরি!

আগে লোকের ঘর যেমন লতাপাতার বানানো ছিল, তাদের মুখের ভাষাও তেমনি ছিলঃ অমার্জিত অশালীন, অশুদ্ধ।

কার্ল মার্ক্স বলেছিলেন যে সাংস্কৃতিক আচার-আচরণ হল ভেতরের মুল অর্থনৈতিক চালিকাশক্তির বাহ্যিক বহিপ্রকাশ। শিষ্টতা একটা পণ্য, যা উৎপাদন করতে খরচ লাগে। গরিবের এতো টাকা নাই যে সে শিষ্ট হবে। সুবিচার একটা পণ্যঃ এটা পেতে টাকা খরচ করতে হয়। একটা গরিব সমাজে বেতনধারী বিজ্ঞ বিচারক আর ফি-পাওয়া বিজ্ঞ উকিল কোথায় যে আপনি সুবিচার পাবেন? চড়ের বদলে থাপ্পড় আর গালির বদলেগালি, হাতাহাতি, চুলোচুলি এই করেই গরিবের চলতে হয়ঃ বেশ ভাল কাপড়চোপড় পরে আদালতে রাজকীয় সমাবেশ ভাবগম্ভীর ভদ্রবচনে বিচার কাজ চালাতে অনেক খরচ হয়। সেটা ধনী লোকের বেলায় হয়, গরিবের বেলায় হয় না।

এখন আপনি কিছু লোকের দেখা পাবেন যারা খুব ভদ্র-শিষ্ট শান্ত-শিষ্ট লেজবিশিষ্ট লোক ছিলেন, নিজের কানে খারাপ কথা শু্নেন নি, নিজের মুখে খারাপ কথা বলন নি। এমন ভাগ্যবান হাজারে একজন ছিলেন কিনা সন্দেহ।

আমার দেখা দুনিয়াটা ছিল গরিব অশিক্ষিত হাল্লাজাল্লাদের দুনিয়া, মুনি-মজুর চোর-চামারদের দুনিয়া। আমার বাপ-চাচার মুখে কোন অশ্লীল কথা শুনিনি, কারণ উনারা ছিলেন মৌল্ভি-মউলানা-হেডমাস্টার-ইমাম ধরণের লোক। কিন্তু আমাদের প্রতিবেশীদের ভাষা ছিল প্রতি বাক্যে ৫ টি শব্দ থাকলে তার তিনটি অশ্লীল রাখা। অশ্লীলতার ডিকশনারি লেখতে হলে আমার কথা মনে রাখবেন, কারণ আমি একদম অশ্লীলতার সাগরে জন্মেছি।

আগে লোকে প্যান্ট পরতো কি? গ্রামের মেয়েরা কেউ কি ১৯৫০ এর আগে ব্রা শব্দটা শুনেছিল? ব্লাউজ পড়েছে শতকরা কয়জন? লোকে ঘরের ভিতরে পান খেয়ে ফ্যাক করে মেঝেতে পিক ফেলছে, সে কি দেখেছেন? সবার চোখের সামনে খোলা জায়গায় বসে বা দাঁড়িয়ে প্রকৃতির পুজা করছে, সেকি দেখেছেন? পুকুরে কেবল লজ্জস্থান ছাড়া বাকি সব উদাম করে নাইতে নেমেছে, সেকি দেখেছেন? বেশ্যবাড়ির লাগোয়া মসজিদ, দেখেছেন?

শিষ্টতা একটা অতি আধুনিক অতি কৃত্রিম ভন্ডামি মাত্র। শিষ্টরা মিষ্ট ভাষায় মিথ্যা বলে, ভদ্র কাপড় পরে সব অভদ্র আচরণ করে। ভদ্রতার পরাকাষ্টা দেখিয়ে তারপর ঘুষ নেয়। গ্রামের লোক বাজে কথা বলত, কিন্তু মিথ্যা কম করে বলত। ওরা ভন্ড ছিলো অনেক কম।

যে যত বেশি শিষ্ট, সে তত বেশি ভন্ড। গ্রামের লোক খারাপ, কিন্তু স্বীকার করে সে খারাপ। শহরের লোক খারাপ কিন্তু দাবি করে সে ভালো।

এইসব বিচার আচার বাদ দেন। বর্তমান প্রজন্মের কাছে হার মেনে নিন, আপনি ওদের সাথে পারবেন না। আপনার সেকেলে ফান্ডামেন্টালিস্ট শিষ্টাচার বাতিল হয়ে গেছে। বুড়াদের বাতিল হয়ে যাওয়া কিতাবগুলি আর পড়ে লাভ নেই। যার স্মার্টফোন নাই, তার সাথে কথা বলাই বন্ধ করে দিন। কি হবে বুড়াদের কালের বস্তাপঁচা কিসসা শুনে? এস-এম-এস করুন, কিসের আবার কথা? ওয়াজ করবেন? ব্যস, ইউটিউব ধরুন। মিষ্টি মিষ্টি কথা কইবেন, মুচকি মুচকি হাসবেন। আর আশায় আশায় থাকবেন যে ইউটিউব কিছু দেবে। ব্যস, এই তো আসল মহিমা।

পায়ে ধরে সালাম করবে আশা করেন? হাইজিন মানেন তো? পায়ে ধরলে সেই হাত স্যনিটাইজ করবেন তো? আপনার পায়ে চর্ম রোগ নেই সেটা কে সার্টিফাই করেছে?

ভুলে যান গতকালের কথা। আগামী দিনের কথা ভাবুন।

সত্যি কাহিনী। আমার ছেলে মেয়ে বড় হয়েছে আমেরিকায়, বাংলাদেশের কায়দাকনুন এটিকেট জানে না। ১৯৯৫ তে দেশে গেছি, গ্রামের বাড়ীতে। বড় ছেলেকে সাথে নিয়ে গ্রামের বাড়ি বাড়ি যাবো, তালিম দিলাম কি করে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করতে হবে। এর মাঝে এক ভিখারি হাঁক দিয়েছে। দাড়িঁওয়ালা লুঙ্গি-পাঞ্জাবি পরা বুড়া মানুষ। আমার বড় ছেলে গিয়ে তার পায়ে হাত দিয়ে সালাম করেছে, ভেবেছে মুরুব্বি মানুষ। আমার ভাগ্নী-ভাতিজির দল দেশেই ছিল চিরদিন, এইকান্ড দেখে ওদের হাসি আর থামে না। আমার ছেলে হতভম্ব। আমার মায়ের খুব রাগ হয়ে গেলো নাতির দুর্দশা দেখে। তিনি আমাকে আদেশ করলেনঃ আমার নাতি কারও পা ধরবে না, শুধু মুখে সালাম বলবে।

ধরতে পারলেন খোঁচাটা? বুড়া ভিখারির পা ধরে সালাম করার নিয়ম না থাকলে কোন বুড়ার পা ধরার নিয়ম থাকা উচিত নয়।

আপনার মতামত কমেন্ট এ জানান।