শ‌বে বরাত : করণীয় ও বর্জনীয়। (পর্ব : ০১) মাওলানা সাঈদ আহমদ (দা. বা.)

shab-e-barat
shab-e-barat

আল্লাহ তাআলা তাঁর চিরন্তন ধারা অনুযায়ী কোন স্থানকে অন্য স্থানের উপর, কোন সময়কে অন্য সময়ের উপর শ্রেষ্ঠত্ব ও মাহাত্ম্য দান করেছেন। মাহে রমজান সকল মাসের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ও সুমহান। জুমার দিন অন্য দিনের তুলনায় মর্যাদাবান। অন্যান্য স্থানের উপর মক্কা-মদীনার অধিক সম্মান। অনুরূপ শবে কদরের পরে অন্যান্য রজনীর চেয়ে শবে বরাতের স্থান।

মুসলমানদের এই করুণ অবস্থায় যেখানে আমাদের এক হয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া দরকার, সেখানে সাধারণ ও মুস্তাহাব বিষয়ে কলহ সৃষ্টি করা এবং এ নিয়ে মাতামাতি করা উম্মতের ঐক্যের জন্য অনেক ক্ষতিকর। তবে উম্মতের ঐক্যের পাশাপাশি, কুরআন-সুন্নাহর সঠিক বুঝের অভাবে কেউ যেন কোন আমল ছেড়ে না দেন কিংবা আমলের নামে বিদআত বা শরীয়তবিরোধী কাজে লিপ্ত না হয়ে পড়েন সেদিকে খেয়াল রাখাও জরুরী। কারণ আমরা সবাই জানি আল্লাহ পাক মানুষকে সৃষ্টি করেছেন তাঁর ইবাদতের জন্য।তাই ইবাদতে যাতে কম না হয় কিংবা ইবাদতে যাতে শরীয়তবিরোধী কিছু না হয় এজন্য আমাদেরকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।

আজকাল শবে বরাত নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। শবে বরাতকে কেন্দ্র করে লোকজন কলহ-বিবাদে জড়িয়ে পড়ছে। কেউ কেউ এর ফাযায়েল ও গুরুত্ব বর্ণনা করছেন। আবার কেউ কেউ এর অস্তিত্বকেই পুরোদমে অস্বীকার করে বসছেন। এমন কি এটা হিন্দুদের লক্ষ্মীপূজা সাদৃশ্যও বলছেন নাউযুবিল্লাহ। আবার কেউ আমলের নামে এমন সব কাজও করছেন, যা কুরআন-হাদীসের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এক্ষেত্রে অনেকে বিধর্মীদের রেওয়াজও অনুসরণ করেছেন।

এতদিন পর্যন্ত শবে বরাতকে কেন্দ্র করে একশ্রেণীর মানুষ বাড়াবাড়িতে লিপ্ত ছিল। তারা এ রাতটি উপলক্ষে নানা অনুচিত কাজকর্ম এবং রসম-রেওয়াজের অনুগামী হচ্ছিল। উলামায়ে কেরাম সবসময়ই এসবের প্রতিবাদ করেছেন এবং এখনো করছেন।

ইদানিং আবার এক শ্রেণীর মানুষের মধ্যে ছাড়াছাড়ির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তাদের দাবি হল, ‘ইসলামে শবে বরাতের কোন ধারণা নেই। এ ব্যাপারে যত রেওয়ায়েত আছে সব মাওযূ বা যয়ীফ। এসব অনুযায়ী আমল করা এবং শবে বরাতকে বিশেষ কোন ফযীলতপূর্ণ মনে করা শরীয়তের দৃষ্টিতে জায়েয নয়।’ তারা এসব বক্তব্যসম্বলিত ছোট ছোট পুস্তিকা ও লিফলেট তৈরি করে মানুষের মধ্যে বিলি করছে।

বাস্তবকথা হল, আগেকার সেই বাড়াবাড়ির পথটিও যেমন সঠিক ছিল না, এখনকার এই ছাড়াছাড়ি মতটিও শুদ্ধ নয়। কেননা শরীয়তে ছাড়াছাড়ির যেমন অবকাশ নেই, তেমনি বাড়াবাড়িরও কোন গ্রহণযোগ্যতা নেই। ইসলাম ভারসাম্যতার দ্বীন এবং এর সকল শিক্ষাই প্রান্তিকতামুক্ত সরল পথের নির্দেশনা দেয়।

শবে বরাতের ব্যাপারে সঠিক ও ভারসাম্যতাপূর্ণ অবস্থান হল, এ রাতের ফযীলত সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। সম্মিলিতভাবে কোন রূপ না দিয়ে এবং এই রাত উদযাপনের বিশেষ কোন পন্থা উদ্ভাবন না করে বেশি ইবাদত করাও নির্ভরযোগ্য হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। এই রাতকে অন্য সব সাধারণ রাতের মত মনে করা এবং এ রাতের ফযীলতের ব্যাপারে যত হাদীস এসেছে তার সবগুলো ‘মাওযূ বা যয়ীফ’ মনে করা যেমন ভুল, তেমনি এ রাতকে শবে কদরের মত বা তার চেয়েও বেশি ফযীলতপূর্ণ মনে করাও একটি ভিত্তিহীন ধারণা।

আমাদের ধারাবাহিক আলোচনাতে শবে বরাতের সঠিক ও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে এবং বাড়াবাড়ি ছাড়াছাড়ির বিরুদ্ধে দলীল-প্রমাণ পেশ করা হয়েছে।

শবে বরাত পরিচিতি

আরবী বছর বা হিজরী সনের ৮ম ও রমযানের পূর্ব মাস হচ্ছে, শাবান। এ শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতকে বলা হয় ‘শবে বরাত’।

শবে বরাতের আভিধানিক অর্থ

শবে বরাত দু’টি শব্দের সমষ্টি। ‘শব’ শব্দটি মূলত ফার্সী, যার অর্থ রাত, রজনী। ‘বরাত’ শব্দকে যদি ফার্সী ধরা হয় অর্থ হবে, সৌভাগ্য। আর শব্দদ্বয়ের একত্র অর্থ হবে, ভাগ্য রজনী বা সৌভাগ্যের রাত।

আর যদি ‘বরাত’ শব্দটি আরবী ‘বারাআত’ ((براءة শব্দের অপভ্রংশ ধরা হয়, তাহলে অর্থ হবে, পরিত্রাণ বা মুক্তি। যেমন, এ অর্থে কুরআনে কারীমে এসেছে। (সূরা কামার : ৪৩)

অতএব শব্দদ্বয়কে আরবীতে অনুবাদ করা হলে বলতে হবে,

“লাইলাতুল “বারাআহ” ((ليلة البراءة। যেমন ইমাম বায়হাকী রাহ. (মৃ. ৪৫৮ হি.) “আদ-দা’ওয়াতুল কাবীর” গ্রন্থে একটি শিরোনাম দিয়েছেন এভাবে,

“বাবুল কাওলী ওয়াদ-দুআ লাইলাতাল বারাআহ” (باب القول والدعاء ليلة البراءة)। তবে হাদীসের ভাষায় বলা হয়েছে, (ليلة النصف من شعبان) অর্থাৎ অর্ধ শাবানের রাত।

উল্লেখ্য, যারা বলেন, ‘শবে বরাত’ বলতে কোন শব্দ কুরআন-হাদীসে নেই, এর কোন ভিত্তি নেই বা পালন করা বিদআত ইত্যাদি। তাদের প্রতি সবিনয়ে প্রশ্ন থাকবে, নামায-রোযা বলতে কোন শব্দও কুরআন-হাদীসে নেই, বরং সালাত ও সওম রয়েছে। এ ক্ষেত্রে কী বলবেন?

শবে বরাতের প্রামাণিকতা

‘ইসলামে শবে বরাত বলতে কিছু নেই’ এই দাবীর উত্তাপন বেশি দিন আগের নয়। গত কয়েক বছর ধরে শোনা যাচ্ছে যে, শবে বরাত (লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান) বিদআত, তা কেবল উপমহাদেশেই পালিত হয় এবং এর কোনো ফযীলত হাদীস শরীফে প্রমাণিত নেই।

আবার এ রাতের ফযীলত সম্পর্কে যত রেওয়ায়েত (বর্ণনা) আছে সবই মাওযূ (বানোয়াট ও গুজব) অথবা যয়ীফ (দুর্বল)। কাজেই শবে বরাতকে ফযীলতপূর্ণ রাত মনে করে এ রাতে জাগ্রত থেকে নামায-দুআ ও যিকির-তেলাওয়াতসহ যে কোন নফল ইবাদত করা বিদআত ও নাজায়েয।

অথচ মুসলিম উম্মাহর মাঝে এ রাতটির গুরুত ও মহত্ত না আজকের, না বছর কয়েক পূ‌র্বের বরং ইসলামের সূচনালগ্ন থেকে যুগের পর যুগ, বছরের পর বছর ধরেই এর ধারা চলে আসছে।

আবার এমনও নয় যে, কারও ভিন্ন প্রক্রিয়ার স্পন্দনে রাতটির গুরুত্ব মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে, বরং এ রাতের ফযীলত ও গুরুত্ব সম্পর্কে দশজন সাহাবী থেকে মারফূ’ হাদীস (সরাসরি রাসূল থেকে) বর্ণিত, যা সমষ্টিগত দিক থেকে সন্দেহাতীতভাবে সহীহ এর মানে উন্নীত।

মুহাদ্দিসীনে কেরাম স্বীয় হাদীসগ্রন্থসমূহে বিভিন্ন শিরোনামে তা লিপিবদ্ধ করেছেন। তাদের কেউ কেউ এগুলো থেকে প্রমাণও গ্রহণ করেছেন। ফুকাহা ও মুফতীগণ হাদীসগুলোর আলোকে ফিকাহর কিতাবসমূহে মুবাহ-মুস্তাহাবের বর্ণনা দিয়েছেন।

এছাড়া অনেকে বিক্ষিপ্ত লিখনী ও বক্তব্যের মাধ্যমে এ রাতের করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়সমূহ তুলে ধরেছেন।

আর এ রাতকে কেন্দ্র করে প্রস্তুত করা হয়েছে গবেষণালদ্ধ অনেক প্রবন্ধ-নিবন্ধ ও ছোট-বড় অসংখ্য গ্রন্থ। সুতরাং শবে বরাতের ফযীলত ভিত্তিহীন বলা অজ্ঞতা বা ভ্রষ্টতা ছাড়া কিছুই নয়। নিম্নে এ সম্পর্কে কিছুটা আলোকপাত করা হল।

হাদীসের আলোকে শবে বরাত

প্রথম হাদীস :

خَلْقِهِ فِي لَيْلَةِ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ فَيَغْفِرُ لِجَمِيعِ خَلْقِهِ إِلَّا لِمُشْرِكٍ أَوْ مُشَاحِنٍহযরত মুআয ইবনে জাবাল রা. বলেন, নবী কারীম ইরশাদ করেছেন, আল্লাহ তাআলা অর্ধ শাবানের রাতে (শাবানের চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাতে তথা শবে বরাতে) সৃষ্টিকুলের প্রতি (রহমতের) দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও হিংসুক ব্যতীত আর সবাইকে মাফ করে দেন। সহীহ ইবনে হিব্বান, হা. ৫৬৬৫

দ্বিতীয় হাদীস :

فَخَرَجْتُ، فَإِذَا هُوَ بِالبَقِيعِ، فَقَالَ: أَكُنْتِ تَخَافِينَ أَنْ يَحِيفَ اللَّهُ عَلَيْكِ وَرَسُولُهُ؟ قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللهِ! إِنِّي ظَنَنْتُ أَنَّكَ أَتَيْتَ بَعْضَ نِسَائِكَ، فَقَالَ: إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ يَنْزِلُ لَيْلَةَ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا، فَيَغْفِرُ لأَكْثَرَ مِنْ عَدَدِ شَعْرِ غَنَمِ كَلْبٍআয়েশা রা. বলেন, এক রাতে আমি রাসূলুল্লাহকে বিছানায় না পেয়ে খুঁজতে বের হলাম, ‘বাকী’ নামক (জান্নাতুল বাকী) কবরস্থানে তাঁকে পেলাম। তখন (আমার অবস্থাদৃষ্টে) রাসূল বললেন, তুমি কি মনে কর আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তোমার উপর জুলুম করবেন? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি ধারণা করেছিলাম, আপনি অন্য কোন স্ত্রীর ঘরে (কারণবশত) তাশরীফ নিয়েছেন। তখন রাসূল ইরশাদ করলেন, আল্লাহ তাআলা অর্ধ শাবানের রাতে দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন এবং “কাল্ব” গোত্রের ছাগলসমূহের পশমের চেয়েও অধিক সংখ্যক গুনাহগারকে ক্ষমা করে দেন। (মুসনাদে আহমদ হা. ২৬০১৮; সুনানে তিরমিযী হা. ৭৩৯; ইবনে মাজা হা. ১৩৮৯)

সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা :

‘কালব’ গোত্রের কথা এই জন্য বলা হয়েছে যে, তখনকার সময় আরব দেশে তাদের চেয়ে বেশি ছাগল আর কারো ছিল না। উদ্দেশ্য হচ্ছে, উক্ত রাতে আল্লাহ পাকের ব্যাপক ও অধিকহারে মাগফিরাত ও ক্ষমার প্রতি উম্মতের দৃষ্টি আকর্ষণ করা। (শরহুয যুরকানী আলাল মাওয়াহিবিল লাদুন্নিয়্যা, যুরকানী ১০/৫৬০ )

শবে বরাত সম্পর্কে আরো নয়টি হাদীসের সংক্ষিপ্ত বিবরণ

এ রাত সম্পর্কে উলি­খিত প্রথম ও দ্বিতীয় হাদীসের মূল বক্তব্য সম্বলিত আরো নয়জন সাহাবায়ে কেরাম থেকে বর্ণনা পাওয়া যায়। লেখার কলেবর বৃদ্ধির আশংকায় পৃথক পৃথকভাবে না বলে মূলকথা তুলে ধরা হলো।

উল্লিখিত সাহাবীদ্বয় ব্যতীত আরো যে সমস্ত সাহাবী রাসূল থেকে এ রাত সম্পর্কে হাদীস বর্ণনা করেছেন (সাহাবা এজন্য বলেছি যে, তাবিয়ী থেকেও এ রাত সম্পর্কে সহীহ ও দুর্বল সনদে বর্ণনা রয়েছে) তারা হলেন-

পূর্বের সাহাবীদ্বয়সহ (৩) প্রথম খলীফা হযরত আবু বকর রা. (৪) আবু সা’লাবা আল-খুশানী (৫) আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (৬) আবু মুসা আল-আশআরী (৭) আবু হুরায়রা (৮) আউফ ইবনে মালিক (৯) উসমান ইবনে আবীল আস (১০) আবু দারদা (১১) ও আবু উমামা রাযিয়াল্লাহু আনহুম প্রমুখ।

প্রথম থেকে অষ্টম সাহাবী পর্যন্ত হাদীসসমূহ সবিস্তারে জানার জন্য দেখুন শায়খ আলবানীর “সিলসিলায়ে সহীহা” ৩/১৩৫-১৩৮ হা. ১১৪৪। নবম হাদীস দেখুন বায়হাকীর “শুয়াবুল ঈমান” হা. ৩৫৫৫। দশম হাদীস রয়েছে হাফেজ আব্দুল গণী মুকাদ্দিসী (মৃ. ৬০০ হি.) এর “আহাদীসুল জামায়ীলী” নামক গ্রন্থে হা. ৩৭। আর একাদশ হাদীস পাবেন হাসান খল্লাল (মৃ. ৪৩১ হি.) এর “আল-মাজালিসুল আশারা আল-আমালী” কিতাবে হা. ৩।)