শ‌বে বরাত : করণীয় ও বর্জনীয়। (পর্ব : ০২) মাওলানা সাঈদ আহমদ (দা. বা.)

shab-e-barat
shab-e-barat

শবে বরাতের ফযীলতকে কেউ কেউ ভিন্ন আঙ্গিকে অস্বীকারের অপপ্রয়াস চালান। আর তা এভাবে যে, “এ রাতের ফযীলত অন্যান্য রাতের চেয়ে ব্যতিক্রম নয়। কেননা এ রাতে যেভাবে আল্লাহ পাক নিচের আসমানে আসেন এবং বহু সংখ্যক বান্দাকে ক্ষমা করেন, তেমনিভাবে প্রতি রাতের শেষভাগেও তিনি দুনিয়ার আসমানে এসে অনেক বান্দাকে ক্ষমা করেন।

যেমন, বিশুদ্ধ ও প্রসিদ্ধ হাদীস, যা রাসূল সা. থেকে আটাশ জন সাহাবী বর্ণনা করেছেন।

মুসলিমের হাদীসটি এভাবে এসেছে :

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ : إِذَا مَضَى شَطْرُ اللَّيْلِ، أَوْ ثُلُثَاهُ يَنْزِلُ اللَّهُ تَبَارَكَ وَتَعَالَى إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا، فَيَقُولُ: هَلْ مِنْ سَائِلٍ يُعْطَى؟ هَلْ مِنْ دَاعٍ يُسْتَجَابُ لَهُ؟ هَلْ مِنْ مُسْتَغْفِرٍ يُغْفَرُ لَهُ؟ حَتَّى يَنْفَجِرَ الصُّبْحُ.

আবু হুরায়রা রা. বলেন, রাসূল সা. ইরশাদ করেন, রাতের একাংশ বা দুই-তৃতীয়াংশ অতিবাহিত হলে আল্লাহ পাক দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন। অতঃপর বলতে থাকেন, কে আছ আমার নিকট কিছু চাইবে? আমি তাকে প্রদান করব। কে আছ আমার নিকট দুআ করবে? আমি তার দুআ কবুল করব। কে আছ আমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবে? আমি তাকে ক্ষমা করে দিব। এভাবে ফজর পর্যন্ত বলতে থাকেন। সহীহ (মুসলিম হাদীস নং- ৭৫৮)

বর্ণিত হাদীস থেকে বুঝা যায়, এ রাত এবং বছরের অন্য রাতের মাঝে তেমন কোন পার্থক্য নেই। কাজেই এ রাতকে বিশেষভাবে ফযীলতপূর্ণ মনে করার কোন যৌক্তিকতা নেই।

এ প্রসঙ্গে সঠিক ও বাস্তব কথা হল, যদিও অগভীর চিন্তার কারণে বাহ্যিকভাবে মনে হয় এ রাত এবং বছরের অন্য রাতের মাঝে তেমন কোন ফরক নেই।

কিন্তু হাদীস বিশারদদের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ থেকে এ রাতের তিনটি বৈশিষ্ট্য জানা যায় :

ক. মোল্লা আলী কারী রাহ. (মৃ. ১০১৪ হি.) ‘মিরকাত’ গ্রন্থে লিখেন-

وظاهر الحديث: أن هذا النزول يعم هذه الليلة، فتمتاز بذلك على سائر الليالي; إذ النزول الوارد فيها خاص بثلث الليل.

অর্থাৎ “হাদীসের ভাষ্য থেকে এ কথা প্রকাশ পায় যে, এ রাতে আল্লাহ পাক নিচের আসমানে অবতীর্ণ হওয়াটা অন্যান্য রাত থেকে ভিন্ন। কেননা অন্যান্য রাতে অবতীর্ণ হওয়াটা রাতের তৃতীয়াংশে হয়। আর এখানে পুরো রাত জুড়েই হয়। ফলে এর মাধ্যমে রাতটি অন্যান্য রাত থেকে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ হয়। (মিরকাতুল মাফাতীহ, মোল্লা আলী কারী ৩/৩৭৫)

খ. এ রাতে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে মাগফেরাতের দ্বার ব্যাপকভাবে উন্মুক্ত হয, যা অন্যান্য রাতে হয় না। যেমন, হাফেজ যাইনুদ্দীন ইরাকী রাহ. (মৃ. ৮০৬ হি.) আয়েশা রা. এর হাদীসের ব্যাখ্যায় উল্লিখিত বৈশিষ্ট্যদ্বয়ের কথা উল্লেখ করে সুস্পষ্টভাবে বলেন,

مزية ليلة نصف شعبان – مع أن الله تعالى ينزل كل ليلة – أنه ذكر مع النزول فيها وصف آخر لم يذكر في نزول كل ليلة, وهو قوله: “فَيغْفِرُ فِيها لِأَكْثَرَ مِنْ عَدَدِ شَعْرِ غَنَمِ كَلْبٍ”، وليس

ذا في نزول كل ليلة. ولأن النزول في كل ليلة مؤقت بشطر الليل، أو ثلثه وفيها من الغروب.

অর্থাৎ “বছরের প্রতি রাতে আল্লাহ পাক অবতরণ করলেও ভিন্ন দু’টি কারণে অর্ধ শাবানের রাতটি অন্যান্য রাত থেকে বৈশিষ্ট্যম‌ণ্ডিত।

এক. অধিক সংখ্যক বান্দাকে ক্ষমা করে দেন, যা অন্যান্য রাতে হয় না।

দুই. এ রাতে সূর্য অস্ত যাওয়া তথা মাগরিব হওয়ার সাথে সাথে অবতরণ করেন, যা অন্যান্য রাতে রাত্রির শেষাংশে বা তৃতীয়াংশে হয়। (ফয়যুল কাদীর, মুনাবী ২/৩১৭ হা. ১৯৪২)

গ. বছরের প্রতি রাতে আল্লাহ পাকের অবতরণের হুকুমের মধ্যে এই রাত অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পরও বিশেষভাবে এই রাত্রিতে অবতরণের কথা পুনরাবৃত্তি করাটা নিশ্চয় এ রাতটি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার প্রমাণ বহন করে। যেমনটি হাফেজ আবু মুসা মাদীনী রাহ. বলেছেন।

আরো একটু ব্যাখ্যা করলে এভাবে বলা যেতে পারে, বিশেষভাবে এই রাতে “আল্লাহ পাকের নিচের আসমানে অবতীর্ণ হওয়ার কথা”- হতে পারে এই জন্য উল্লেখ করা হয়েছে- আমরা যাতে সতর্ক হই।

গাফলত ও আলস্যতার ঘুম থেকে জাগ্রত হই। যেন বলা হচ্ছে, “হে বান্দা! বছরের প্রতিটি রাতের শেষ বা তৃতীয়াংশে আমি আল্লাহ অবতরণ করি ক্ষমা প্রদানের জন্য, আশা পূরণ করার জন্য। কিন্তু এ সুযোগ হেলায় খেলায় হারিয়েছ। আর নয়, এবার ব্যাপকহারে পুণ্য অর্জনের মৌসুমটি (রমযান মাস) নিকটবর্তী হয়েছে। শাবানের অর্ধেক অতিবাহিত হয়ে গেল, এবার ফিরে এস, সুযোগের সৎ ব্যবহার কর আর আমলে উৎসাহী হও।

আল্লাহ পাক এই রাতে মাগরিব হওয়ার সাথে সাথে অবতরণ করেন, পুরো রাত জুড়েই থাকেন, রহমত ও মাগফিরাত অধিকহারে বিতরণ করেন। সুতরাং তা গ্রহণে ব্যস্ত হও”।